সময় সংকোচনে বিক্রি কমার শঙ্কা, বাড়তে পারে অর্থনৈতিক চাপ

মোস্তফা রনি: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোর সময়সীমা সংকোচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা—যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নির্ভর করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে তার ওপর। বর্তমান সময়সূচি সেই বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের নগরজীবনে একটি বড় অংশের মানুষ দিনভর কর্মব্যস্ত থাকেন। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য পেশাজীবীরা সাধারণত বিকেল বা সন্ধ্যার পরই অবসর সময় পান। ফলে তাদের কেনাকাটার প্রধান সময় হয়ে ওঠে সন্ধ্যা থেকে রাত। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বড় শহরগুলোর মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে বিকেল ৫টার পর ক্রেতার উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে বিক্রির সর্বোচ্চ সময় (peak hour) লক্ষ্য করা যায়। এই সময়েই ব্যবসায়ীরা তাদের দিনের উল্লেখযোগ্য অংশের বিক্রি সম্পন্ন করেন।

এমন বাস্তবতায় যদি মার্কেটের কার্যক্রম বিকেলের আগেই সীমিত করা হয় বা রাতের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা সরাসরি বিক্রির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খুচরা ব্যবসায়ী সমিতির একাধিক প্রতিনিধির মতে, সময় সংকোচনের ফলে অনেক দোকানদারের দৈনিক বিক্রি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও লাইফস্টাইল পণ্যের ক্ষেত্রে সন্ধ্যার পর ক্রেতার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্য সঠিক হলেও নীতিনির্ধারণে চাহিদাভিত্তিক বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে। তাদের মতে, “ডিমান্ড-সাইড ম্যানেজমেন্ট” বা চাহিদা-ভিত্তিক সময় নির্ধারণ না করে যদি কেবল সরবরাহ-সংকটের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ খুচরা বাণিজ্য খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং এই খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত।

একই সঙ্গে ভোক্তা আচরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশই সপ্তাহের কর্মদিবসে সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সপ্তাহান্তে (শুক্র ও শনিবার) এই প্রবণতা আরও বেশি। ফলে যদি সেই সময়গুলোতে মার্কেট বন্ধ থাকে, তাহলে ক্রেতারা প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগ হারান, যা সামগ্রিক ভোগব্যয় (consumption) কমিয়ে দিতে পারে। আর ভোগব্যয় কমে গেলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

এই প্রেক্ষাপটে আমার মতে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব হতে পারে—মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলো দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখা। এতে করে দিনের কম চাহিদার সময় (সকাল) বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, আবার বিকেল ও রাতের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে ক্রেতাদের কেনাকাটার সুযোগও নিশ্চিত করা যাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সময়সূচি “পিক আওয়ার”কে কাভার করে, ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের বিক্রির বড় অংশ বজায় রাখতে পারবেন এবং একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সময় সংকোচন নয়, বরং বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেমন—শপিংমলগুলোতে শক্তি-সাশ্রয়ী (energy-efficient) লাইটিং, সোলার প্যানেল ব্যবহার, এবং এয়ার কন্ডিশনিংয়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। এতে করে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হতে পারে।

এছাড়া নীতিনির্ধারণে অঞ্চলভেদে ভিন্নতা আনার প্রস্তাবও এসেছে। বড় শহর, ছোট শহর ও জেলা পর্যায়ের বাজারগুলোর ক্রেতা আচরণ এক নয়। ঢাকার মতো মহানগরে যেখানে সন্ধ্যার পর বেচাকেনা বেশি, সেখানে হয়তো সময় বাড়ানো যেতে পারে; অন্যদিকে কম জনবহুল এলাকায় ভিন্ন সময়সূচি কার্যকর করা যেতে পারে। এতে করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পাওয়া সম্ভব।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় হলেও এর বাস্তবায়নে আরও তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। শুধুমাত্র জ্বালানি সাশ্রয় নয়, অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায়, এই ধরনের সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সাশ্রয় করলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি করে আর্থিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

অতএব, এখন প্রয়োজন সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—এই তিন পক্ষের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা। তথ্য-উপাত্ত ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হলে জ্বালানি সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক:
মোস্তফা রনি
ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক ও পিআর প্রফেশনাল

শেয়ার করুন