বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জনসংখ্যাকে দীর্ঘদিন সম্ভাবনার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শুধু জনসংখ্যা বেশি থাকাই আর কোনো দেশের শক্তি নয়। সেই জনসংখ্যা কতটা শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল—এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে গতি কমেছে, মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট রয়েছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণসেবা প্রত্যাশিত মাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যে সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছিল, তা ধরে রাখতে হলে এই খাতকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের কারণ শুধু জন্মহার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও রোবোটিক্স উৎপাদন ও সেবাখাতের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, আগামী বছরগুলোতে অনেক প্রচলিত পেশার চাহিদা কমবে, আবার নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত না থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। একই সময়ে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনো স্বল্প ও মধ্যদক্ষ শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে যদি এই ধরনের শ্রমের চাহিদা কমে যায়, তাহলে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জনসংখ্যাগত সুবিধা দ্রুত জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে আগের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে হবে। মাঠপর্যায়ের শূন্যপদ পূরণ, পরিবারকল্যাণকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা জোরদার করা প্রয়োজন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে কেবল স্বাস্থ্য খাতের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে। প্রচলিত সনদনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও কর্মমুখী শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার মতো খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না করতে পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
জনমিতিক সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই অনুকূল অনুপাত কয়েক দশক পর স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হবে। তাই বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ অতীতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন থাকলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সমন্বয় ঘটানো। জনসংখ্যাকে কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, দক্ষতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
জনসংখ্যা কোনো দেশের বোঝা নয়, আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদও নয়। রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষা এবং বিনিয়োগই নির্ধারণ করে জনসংখ্যা দেশের অগ্রযাত্রার শক্তি হবে, নাকি উন্নয়নের পথে নতুন সংকট তৈরি করবে। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
মোস্তফা রনি
সাংবাদিক, লেখক ও কমিউনিকেশন এক্সপার্ট









