শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে বিইআরসিকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের তামাশা চলছে। এ তামাশা এখন মানুষের জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিচ্ছে। আজকে বক্তব্যের শুরুতেই ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার। কয়েকদিন আগে আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি সোলার এনার্জি খাতে প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ীকে আমার অফিসে নিয়ে এলেন। তাদের আক্ষেপ, আমি নাকি ব্যবসায়ীদের গালমন্দ করি, ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলি। তারা বলেন, এতে তাদের মন খারাপ হয়। তখন আমি তাদের বলেছিলাম, ‌আমরা চাই এ দেশে নিজস্ব পুঁজি গড়ে উঠুক। টাটা, বিড়লা, এমনকি জার্মানির সিমেন্সের মতো কোম্পানি বাংলাদেশে তৈরি হোক। দেশে দেশে বিনিয়োগ করুক। তবে সামিট যেন তৈরি না হয়। সামিট হওয়া বন্ধ করে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টাটা বা সিমেন্সের মতো করে গড়ে তোলা কার দায়িত্ব? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ রইল।

২০২১ সালে আদালতের আদেশে (কন্টেম্পট অব কোর্টের রুলের মুখে) এলপিজি খাতে বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানি চালু করতে বাধ্য হয়েছিল। তখন এলপিজি ব্যবসায়ীরা সেই ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করলেন না কেন? অনুষ্ঠানের আলোচনায় যেসব কথা উঠে এসেছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যবসায়ী এবং তাদের পুঁজির নিরাপত্তাহীনতা। গণশুনানিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ‘‌রেট অব রিটার্ন’ ৭ শতাংশ দেয়া হয়েছিল। তখন এ খাতের ব্যবসায়ীদের কেউ প্রশ্ন তোলেননি কেন? তিতাসের শেয়ারহোল্ডারদের রেট অব রিটার্ন ১৮ শতাংশ কীভাবে বিইআরসি দিল?

ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি চাইবেন তিতাসের সমান সুবিধা পেতে, কিন্তু চাইবেন না তিতাসকে নিজের সমান করতে। তিতাসকেও আমাদের সমান করতে হবে—এ কথা যেদিন বলতে পারবেন সেদিন ব্যবসায়ীরা টেকসই হবেন। এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা সাহসী ভাষা শিখতে পারেননি। আমরা সেটিই শেখাতে চাই। আমরা চাই, ব্যবসায়ীরা সত্যিকারের প্রতিষ্ঠিত ও টেকসই পুঁজিপতি হয়ে ওঠেন। যদিও আমার ছাত্রছাত্রী বা বন্ধুবান্ধব যারা বামপন্থী বা কমিউনিস্ট রাজনীতি করেন, তারা আমার এ কথাকে সমর্থন করবেন না। দেশীয় পুঁজির বিকাশ ছাড়া জাতীয় অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। বিদেশী বিনিয়োগে সমৃদ্ধ অর্থনীতি আজ কেন বিপন্ন!

বিইআরসির চেয়ারম্যানের কাছে ব্যবসায়ীদের জানতে চাওয়া উচিত, তিনি কেন গণশুনানি তুলে দিলেন। কেন মাত্র তিনজন প্রতিনিধি নিয়ে ঘরের ভেতর বসে ক্যামেরা ট্রায়ালের মতো কর্মকাণ্ড শুরু করলেন। কার স্বার্থে এমন প্রক্রিয়া চালু হলো? এখানে দাঁড়িয়ে অনেকে গণশুনানি না হওয়া নিয়ে আহাজারি করছেন, অথচ নিজেরাই প্রতিনিধি পাঠিয়ে প্রতি মাসে বন্ধ ঘরে দাম নির্ধারণের খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভোক্তারা এসবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। বিইআরসির বিরুদ্ধে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) অনাস্থা এনেছে। কেন এ অনাস্থা? কারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বিইআরসির নেই। যে কমিশনের সক্ষমতা নেই, সক্ষমতাহীনভাবে তাকে কাজ করতে দিলে বিপর্যয় আরো বাড়বে। তাকে সক্ষম করে তুলতে হলে কঠোর ও ন্যায়বোধ দিয়ে ঝাঁকুনি দিতে হবে। ব্যবসায়ীরা সেই সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারছেন না কেন? ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছভাবে ব্যবসা করতে হবে। আমরা আপনাদের সেবা চাই। সক্ষম কমিশন ছাড়া সে সেবা নিশ্চিত হয় কীভাবে?

এলপিজির বাজার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কীভাবে? পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করে ঢাকার মানুষকে এলপিজি কিনতে বাধ্য করে। কিন্তু বাজার তৈরি করতে জবরদস্তি করা যাবে না। প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দিলে মানুষ এলপিজি কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে। সরকারি মালিকানাধীন এলপিজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। প্রান্তিক জনগণের জন্য এ দাম নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। ভোক্তারা কেন এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না? কেন কোনো চাপ প্রয়োগ করে না? মানুষের অধিকারকে যখন সুরক্ষা দেয়া হবে মানুষ ব্যবসায়ীদের মাথায় করে রাখবে। মানুষের সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে, কেউ সেই প্রমাণ করতে পারছে না।

এলপিজি খাতে তিন ধরনের প্রবিধানমালার কথা বলা হয়েছে। তাহলে কেন রেগুলেটরি কমিশন একটি প্রবিধানমালা তৈরি করল? ২০১২ সালেই ডিস্ট্রিবিউটর, রিটেইলার ও এলপিজি সরবরাহকারীদের জন্য পৃথক তিনটি লাইসেন্স দেয়ার কথা ছিল। তিনটি আলাদা বিধিমালার আওতায় সেগুলো পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কমিশন সবকিছুকে একত্র করে একটি প্রবিধানমালা বানিয়েছে। কেন? কার স্বার্থে? এর ফলে যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন ডিস্ট্রিবিউটর-রিটেইলার হিসেবে, তাদের ব্যবসা আজ অনিরাপদ। তাদের লাইসেন্স প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই, কার্যক্রমে কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। ফলে আজ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রশ্ন হচ্ছে সিলিন্ডার ফাটলে দায় নেবে কে?

যার অবহেলার কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা রেগুলেটরি কমিশনেরই কাজ। কিন্তু কমিশন বলছে, ‘আমাদের লোকবল নেই।’ আমি জানতে চাই, এটি কি কেবল লোকবলের বিষয়? রেগুলেটরকে তো দায়িত্ব নিতে হবে—অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করতে হবে এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হবে। তাদের কাজ কেবল চেয়ারে বসে বিবৃতি দেয়া নয়; মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। যখন সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তখন মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়—এবং সেই ক্ষোভ আজ আমরা সর্বত্র দেখছি।

এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে প্রকৃত অর্থে—কাগজে নয়, কাজে। কারণ যে রাষ্ট্র তার দুর্বলতম নাগরিককে রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের বড় বড় গল্পও একদিন ধুলোয় মিশে যায়। ভোক্তা-উদ্যোক্তারা, লাইসেন্সধারী অংশীজনরা বাস্তবায়ন করবে। দরকার হলে আদালতে যাবে। কিন্তু এমনভাবে সমঝোতার একটি জায়গা তৈরি করার উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। রেগুলেটরকে রেগুলেটরি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে হবে। মন্ত্রণালয়কে নিষ্ক্রিয় করতে হবে।

ব্যবসায়ীকে কোনো লাইসেন্স নিতে হলে তাকে ১৫-২০ জায়গায় যেতে হয়। এক্ষেত্রে সব জায়গায় ঘুস দিতে হয়। অনিয়ম হয়। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে রেগুলেটরি কমিশনকে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে।

ভোক্তার জ্বালানি নিরাপত্তা নেই। ব্যবসায়ীদের পুঁজির নিরাপত্তা নেই। তাহলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী এক হচ্ছে না কেন? ব্যবসায়ী সেবা প্রদান করবে এবং ভোক্তা সেবা গ্রহণ করবে। তাই ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি হতে হবে। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হলে প্রত্যেকের স্বার্থ সংরক্ষণ হবে। সবাই লাভবান হবেন। নইলে ব্যবসায়ীরা ভেসে যাবেন, আমরা ভোক্তারা বিদ্রোহী হব।

এম শামসুল আলম: অধ্যাপক ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা

শেয়ার করুন