তিস্তা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি। তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাঙ্গন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়( বুয়েট) এ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বুয়েটের পানিসম্পদ কোশল বিভাগের আয়োজনে “তিস্তা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি এসময় উপস্থিত ছিলেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রী আরও বলেন, তিস্তা উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলার মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ তিস্তা অববাহিকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কারণ। নদীর ভাঙ্গন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে অতিদ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে তিনি জানান।
এ্যানি চৌধুরী আরও বলেন, দেশের স্বার্থ জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। গঙ্গা চুক্তি বিষয়ে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে যথাসময়ে চুক্তি নবায়নের কাজ চলছে। পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা পাড়ের মানুষের হাহাকার কাছ থেকে দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। অতিদ্রুত তিস্তা পাড়ের মানুষের দূর্দশা লাগবে গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রত্যাশা করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আজাদ বলেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া তিস্তা মহাপরিকল্পনার ব্যবস্থাপনা টেকসই করতে সরকার কাজ করছে। ইতোমধ্যে কারিগরী কমিটির গঠন করা হয়েছে, দেশী-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তিস্তায় টেকসই সমাধানের পাশাপাশি পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়েও সরকার সজাগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিস্তা চ্যালেঞ্জেস বিষয়ে কী নোট উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মাসফিকুস সালেহীন, পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট, বুয়েট, সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট অপশানস বিষয়ে অধ্যাপক ড. মোঃ আতাউর রহমান, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট এবং ওয়াটার কনজার্ভেশন অ্যান্ড ইরিগেশন ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে ড. মোহা. সরফরাজ বান্দা, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী৷ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রংপুর।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার আজিম উদ্দিন। প্যানেল আলোচনা করেন অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, উপদেষ্টা যোথ নদী কমিশন, অধ্যাপক ড. আবুল ফজল এম সালেহ, প্রাক্তন অধ্যাপক বুয়েট, মো: রুহুল আমিন, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রমুখ।
আমিন উর রশিদ জানান, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং মাছ সংরক্ষণে কাজ শুরু করেছে।
তিনি বলেন, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত চাপ মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও প্রজননকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পরিবেশসম্মত ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। সীমিত জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক মাছ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সেমিনার হলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আয়োজিত সেমিনার
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের মিঠাপানির মাছের বড় বাজার রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হলে শুধু বাংলাদেশিরা যে ধরনের মাছ খায় তা নয়, যে দেশে মাছ রপ্তানি করা হবে সে দেশের মানুষের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী মাছ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে।
চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর রপ্তানি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি পোনা ও প্রজনন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন ও লালন-পালন করা গেলে এ খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
আমিন উর রশিদ মৎস্য উৎপাদনে গুণগত মান, নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক ও পেশাজীবীদের কার্যকর পরামর্শ সরকারকে সহযোগিতা করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের বেড়ে ওঠা ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নদী-নালা দখল, নাব্যতা সংকট ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানিদূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনতে নদী ও খালের নাব্যতা বজায় রাখা এবং নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবার খাল ও নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় খননকাজ হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।
মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে একদিকে খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে জেলাভিত্তিক সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান। উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা।





