ধূমপান ত্যাগে সৌদি আরবের কার্যকর উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্যের জনস্বাস্থ্য পরিবর্তনের যাত্রায়এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে সৌদি আরব। দেশটি এক মিলিয়ন ধূমপায়ীকে ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করার এক সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ)-এর অর্থায়নে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘বাদায়েল’ এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের প্রধান পণ্য তামাকমুক্ত নিকোটিন পাউচ ‘ডিজার্ট’, যা ধূমপায়ীদের সিগারেট থেকে ধীরে ধীরে দূরে যেতে সহায়তা করছে।

বাদায়েলের প্রভাব যেমন দ্রুত, তেমনি উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠার পর মাত্র ২৪ মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ লাখ ধূমপায়ীকে ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করেছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিকোটিন ব্যবহার বন্ধ করেছেন। এই অসাধারণ সাফল্যের ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বাদাইল ২০৩২ সালের পরিবর্তে ছয় বছর আগেই-অর্থাৎ ২০২৬ সালের মধ্যেই এক মিলিয়ন ধূমপায়ীকে সহায়তা করার লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

ধূমপান কমানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের কৌশলটি এই অঞ্চলজুড়ে প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা-ভিত্তিক নীতি থেকে একেবারেই আলাদা। দেশটি নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির পরিবর্তে গুরুত্ব দিচ্ছে ‘হার্ম রিডাকশন’ বা ক্ষতি কমানোর বিজ্ঞানে ভিত্তিক মডেলে, যেখানে ধূমপায়ীদের জন্য নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন সৌদি ভিশন ২০৩০-এর বিস্তৃত লক্ষ্যের অংশ, বিশেষ করে ‘কোয়ালিটি অব লাইফ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে, যার উদ্দেশ্য হলো অগ্রসর স্বাস্থ্য সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করা।

এই কৌশলের মূলে রয়েছে নিকোটিন পাউচ ‘ডিজার্ট’-এর মত আধুনিক সমাধান। ‘ডিজার্ট’ এর মতো পণ্যগুলোতে কোনো তামাক নেই, এগুলোতে পোড়ানো বা ধোঁয়া উৎপন্ন হয় না, ফলে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ অনেক কমে যায়। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গবেষণা প্রমাণ করছে যে, সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করা হলে এই ধরনের বিকল্প পণ্য প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় অনেক কম ক্ষতিকর।

এই নতুন পদক্ষেপের ফলাফল ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের প্রাথমিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনগুলো আশাব্যঞ্জক, সম্প্রতি দেখা গেছে ধূমপান-সম্পর্কিত রোগের কারণে হাসপাতাল ভিজিটের সংখ্যা কমে আসছে। একই সঙ্গে জনমতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে; মানুষ এখন ‘হাম রিডাকশন’ বা ক্ষতি কমানোর পদ্ধতিকে ধূমপায়ীদের সহায়তা করার একটি কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করছে।

এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সম্প্রতি বাদায়েল শুরু করেছে ‘লেট’স ক্লিয়ার দ্য এয়ার’ নামের একটি জাতীয় প্রচারণা। এই উদ্যোগে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি পর্যায়ে সবাইকে ধূমপানমুক্ত সউদী আরব গড়ার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রচারণাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, এবং এটি আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ধূমপানমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে সম্মিলিত উদ্যোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

সৌদি আরবের অগ্রগতি এখন এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় একেবারেই ভিন্ন ও উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ এখনো এশিয়ার অন্যতম ভয়াবহ তামাক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৩৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেন, এবং প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যান। বহু দশক ধরে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কর নীতিমালা কার্যকর থাকার পরও আসক্তি সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে, সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা গোটা অঞ্চলের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশটি প্রমাণ করেছে, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত ও টেকসই ফলাফল পাওয়া সম্ভব। বাদায়েল তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সঙ্গে সঙ্গে, সউদী আরব দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুশৃঙ্খল ‘হাম রিডাকশন’ বা ক্ষতি কমানোর কৌশল দীর্ঘদিনের ধূমপানের অভ্যাস থাকা সমাজেও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

শেয়ার করুন