চিকিৎসা ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আগামী জাতীয় বাজেটে হার্টের রিং (কার্ডিয়াক স্টেন্ট), ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম এবং ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানো হতে পারে। একই সাথে সরকারি রাজস্ব বাড়াতে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবগুলো আসছে। বর্তমানে দেশের রোগীদের পরিবারগুলোকে চিকিৎসার পেছনে যে পরিমাণ ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) করতে হয়, তা বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বোচ্চ।
‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি এখন রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা, ওষুধ ও রোগ নির্ণয় (ডায়াগনস্টিকস)-এর উচ্চ ব্যয় অনেক পরিবারকে আর্থিক অনটনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা জরুরি স্বাস্থ্য উপকরণগুলোর ওপর কর ছাড় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্টেন্ট, ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম ও ওষুধের কাঁচামালে প্রস্তাবিত ছাড়
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাজেটে করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিং সরবরাহের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করা হতে পারে। এছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম আমদানির ওপর থাকা ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার।
পাশাপাশি, বর্তমানে শুল্কমুক্ত তালিকায় না থাকা বেশ কয়েকটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধকে কর ছাড়ের আওতায় আনা হতে পারে। দেশীয় ওষুধ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’ (এপিআই) উৎপাদনে বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন কর প্রণোদনাও ঘোষণা করা হতে পারে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবা আরও সাশ্রয়ী করতেই এই পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সাধারণ নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে আগামী বাজেটে বেশকিছু প্রস্তাব থাকবে।”
অপর একজন কর্মকর্তা জানান, ওষুধের সুনির্দিষ্ট কিছু কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক কমানো হতে পারে। সেই সঙ্গে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সম্ভাব্য কর ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে কোন কোন পণ্যের ওপর এর প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে রাজি হননি তিনি।
এর আগে মার্চ ও এপ্রিলে প্রাক-বাজেট সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, আগামী অর্থবছরের বাজেট কাঠামোতে স্বাস্থ্য খাত সুনির্দিষ্ট কিছু কর ছাড় পেতে পারে।
বর্তমানে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে করোনারি স্টেন্ট বা হার্টের রিং সরবরাহের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত রোগীদেরই পরিশোধ করতে হয়। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে হার্টের রিংয়ের দাম কমতে পারে।
তিনি জানান, বর্তমানে একটি করোনারি স্টেন্টের দাম মান ভেদে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা দামের স্টেন্টের ওপর ভ্যাট ছাড়ের ভিত্তিতে হিসাব করলে দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা কমতে পারে। একইভাবে কিডনি ডায়ালাইসিসের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হলে—তা কিডনি চিকিৎসার ব্যয় কমাতেও সাহায্য করবে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর অন্তত ৪৫ হাজার করোনারি স্টেন্টের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) কর্তৃক ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা রোগীদের প্রতি মাসে গড়ে ৪৬ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয়, যার ফলে ৯৩ শতাংশ পরিবারকেই আর্থিক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।





