মধুপুর বনের বানরকলা: লাল গুচ্ছে লুকিয়ে থাকা বুনো স্বাদ

রাশিদুল আলম শিমুল: মধুপুরের শালবনে ঢুকলেই চোখে পড়ে প্রকৃতির বিচিত্র আয়োজন। উঁচু গাছের ছায়া, লতাগুল্ম, পাখির ডাক আর বনের গভীর সবুজের মধ্যে হঠাৎ দেখা মিলতে পারে এমন কোনো ফলের, যার সঙ্গে শহুরে মানুষের পরিচয় প্রায় নেই। তেমনই এক বিস্ময় জাগানো বুনো ফল—বানরকলা।

নাম শুনে কলার কথা মনে হলেও বানরকলা আসলে প্রচলিত কলা নয়। মধুপুর বনের গভীরে লতানো উদ্ভিদে গুচ্ছ গুচ্ছ ধরে এই ফল। পাকলে ফলের রং হয়ে ওঠে লালচে-কমলা। একসঙ্গে অনেকগুলো ফল ঝুলে থাকার দৃশ্য সত্যিই নজরকাড়া। মধুপুর বন থেকে স্থানীয় বাঙালি ও গারো জনগোষ্ঠীর মানুষ এই ফল সংগ্রহ করে থাকেন।

নামের মধ্যেই কৌতূহল জাগায় ‘বানরকলা’। নামটি শুনলেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে—কেন এমন নাম? এটি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি নাম। উদ্ভিদটি মূলত একটি বৃহৎ কাষ্ঠল আরোহী লতা। শক্ত ও দীর্ঘ লতার সাহায্যে বড় বড় গাছ পেঁচিয়ে এরা উঁচুতে উঠে যায়। ফুল ও ফল—দুটিই এই উদ্ভিদকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

আমাদের দেশের লটকন ও আতাফলের মতো বুনো এ ফলটি বনের পশুপাখিরও প্রিয় খাবার। মধুপুর বনে পশুপাখির খাবারের সংকট বহু আগে থেকেই রয়েছে। বানরকলার মতো বনের এমন বাহারি ফল বন্যপ্রাণীর খাদ্যচাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। তবে গত কয়েক দশক ধরে এই ফলে ভাগ বসিয়েছেন বনের আশপাশের মানুষও।

বনের অনেক উদ্ভিদের মতো বানরকলার নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে লোকজ পরিচয়। অঞ্চলভেদে বুনো ফলের নাম বদলে যাওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক। তাই নামটির পেছনে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও পরিচিতির বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।

বানরকলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো লাল গুচ্ছে লুকিয়ে থাকা বুনো ফল। একসঙ্গে অনেকগুলো কিছুটা গোলাকার ফল পাশাপাশি ঝুলে থাকে। পাকলে লালচে-কমলা রং ধারণ করে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, বনের সবুজের মধ্যে কেউ যেন ছোট ছোট লাল পাথরের মালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

ফলের বাইরের আবরণ তুলতুলে ও নরম। সেটি সরালে পাওয়া যায় রসালো অংশ। স্বাদে হালকা টক-মিষ্টি; কারও কাছে লটকন বা লিচুর স্বাদের কথাও মনে হতে পারে। ভেতরে থাকে আতাফল বা আতার মতো কয়েকটি কালো বীজ। ফলের ভেতর মাংসল অংশ তুলনামূলক কম হলেও হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে স্থানীয়দের কাছে এ ফল বেশ জনপ্রিয়।

শুধু ফল নয়, বানরকলার ফুলও বেশ আকর্ষণীয়। এর ফুল উজ্জ্বল লাল এবং পাপড়ি পুরু ও চামড়ার মতো। ফুলে মৃদু সুবাসও রয়েছে। ফুলের গঠনও বেশ স্বতন্ত্র, যা বনের অন্যান্য সাধারণ লতা থেকে এটিকে আলাদা করে চেনার সুযোগ দেয়। একটি বানরকলা লতা যখন বনের কোনো বড় গাছকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠে, তখন শুধু ফলের মৌসুমেই নয়, ফুলের সময়ও নিজের আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত হয়।

মধুপুরের বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এই বনকে ঘিরে বহু মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষ বনের বিভিন্ন ফল, গাছ ও লতাগুল্মের সঙ্গে পরিচিত। বানরকলাও সেই লোকজ জ্ঞানের একটি অংশ।

বনের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে স্থানীয় মানুষ যে খাবার সংগ্রহ করতেন, তার তালিকায় নানা বুনো ফলের উল্লেখ পাওয়া যায়। মধুপুরের বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাকৃতিক ফল একসময় স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

তবে বনের কোনো ফলকে শুধু মানুষের খাবার হিসেবে দেখলে প্রকৃতির আসল গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি বুনো ফল বনের নানা প্রাণী ও পাখির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এ কারণেই বনের বুনো ফল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

এই অবস্থায় বানরকলার মতো স্থানীয়ভাবে পরিচিত বুনো উদ্ভিদ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো শুধু একটি ফল বা একটি লতার পরিচয় নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের প্রকৃতি, মানুষের লোকজ জ্ঞান এবং জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস।

শালবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যদি চোখে পড়ে সবুজ পাতার আড়াল থেকে ঝুলে থাকা লালচে গোল ফলের গুচ্ছ, থমকে দাঁড়ানোর মতোই দৃশ্য সেটি। হাতে তুলে নিলে বোঝা যায়—এটি কোনো বিদেশি ফল নয়, কোনো সাজানো বাগানের ফলও নয়। এটি মধুপুর বনের নিজস্ব এক বুনো পরিচয়।

বানরকলা তাই শুধু একটি ফলের নাম নয়; এটি মধুপুর বনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির এক ছোট্ট বিস্ময়। আর এমন বিস্ময়গুলোকে চিনে রাখা, সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

রাশিদুল আলম শিমুল

শেয়ার করুন