মোঃ ইহসানুল হক সাকিব, কুবি প্রতিনিধি: সেই প্রাচীন আমল থেকে কুমিল্লা ছিল জ্ঞান চর্চার এক ঐতিহাসিক স্থান। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘লালমাটির ক্যাম্পাস’ খ্যাত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মারক শালবনবিহারের শান্ত নীরবতা আর আধুনিক জ্ঞানের প্রাণচাঞ্চল্য একসাথে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব পরিবেশ। সেই পরিবেশে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণী, তাদের আশা, প্রত্যাশা ও অগণিত সম্ভাবনার গল্প।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন শিক্ষার্থীরা আজ এই লাল মাটির ক্যাম্পাসে পদচারণ করেছে। তাদের চোখে মুখে কত কৌতুহল। তারা আজকে পা ফেলেছে এক উন্মুক্ত জগতে। তারা মনে করছে আজকে থেকে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারো চোখ মুখে দেখা যাচ্ছে বিষন্নতা, চিরচেনা পরিবার থেকে চলে এসেছে অচেনা এক জায়গায়। কেউ কেউ সাথে করে নিয়ে এসেছে তাদের অভিভাবক কে।

এই নতুন পরিবেশে আসতে তাদেরকে অনেক সাধনা করতে হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হয়েছে। প্রত্যেক জনের সফলতার পিছনে রয়েছে এমন শত শত হাসি-কান্নার এবং সংগ্রামের গল্প। নতুন শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও দারুন।
লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাবের হোসেন বলেন, “আমরা আজ যেখানে আছি সেটা সাধারন কোন জায়গা না এটা সেই প্রাচীন আমল থেকে শিক্ষা কেন্দ্রের এক ঐতিহাসিক স্থান। শ্রী ভবদেব শালবন বিহার প্রতিষ্ঠার করার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ছুটি আছে মৌমাছির মত। আজকে আমি অনেক বেশি এক্সাইটেড। আজকে আমাদের সুন্দর একটা অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য সিনিয়র ভাই বোনদের ধন্যবাদ জানাই।”
একই সেশনের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ মেহেদী হাসান তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “ভার্সিটির প্রথম দিনটা সত্যিই আমার জীবনের একটি বিশেষ দিন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, আর এক অন্যরকম অনুভূতি—সব মিলিয়ে দিনটা ছিল অসাধারণ। ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামটি খুব সুন্দরভাবে আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের ডিপার্টমেন্ট সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছি।স্যারদের ব্যবহার ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণামূলক। তাদের দিকনির্দেশনা মূলক কথা শুনে পড়াশোনা নিয়ে আরও আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। এমনকি আমাদের যে কোন সমস্যা তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে বলেছে যা আমাদের জন্য বড় একটা স্বস্তির বিষয়। সব মিলিয়ে, প্রথম দিনের এই অভিজ্ঞতা আমার মনে একটি সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।”

একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী সাকিন আকন্দ বলেন,”কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হয়ে নিজেকে গর্বিত বোধ করছি।এটার জন্য আমাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে।ভর্তির সময় স্যারদের ব্যবহার অনেক ভালো ছিল। আমাদের সিনিয়র ভাইরা আমাদের বাসা খুঁজতে সাহায্য করেছে। সবশেষে আমরা একটা র্যাগিং মুক্ত ক্যাম্পাস চাই।আজকে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামটা ভালো ছিল। সিনিয়র ভাই- বোন এবং শিক্ষক উভয়ের ব্যাবহার অনেক ভালো ছিল। ক্যাম্পাস টা বেশ সুন্দর। আমরা এইরকম ক্যাম্পাস আর সিনিয়র ভাইদের ভালো আচরন পেয়ে আনন্দিত। সবশেষে আজকের দিন টা বেশ ভালো কেটেছে।”
ইংরেজি বিভাগের এক নবীন ছাত্রী বলেন,
“প্রথমদিন একটু ভয় লাগছিল, সবকিছু অচেনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন বন্ধু হয়ে গেছে, সিনিয়ররাও অনেক সাহায্য করছে। এখন মনে হচ্ছে এই জায়গাটাই আমার নিজের হয়ে যাবে খুব দ্রুত।”
আজ ক্যাম্পাসের পথে পথে নবীনদের চোখে যে স্বপ্নের দীপ্তি দেখা গেছে, তা যেন সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল আভাস। এই স্বপ্নগুলো যদি সঠিকভাবে লালন ও পরিচর্যা করা যায়, তবে একদিন তা মহীরুহে পরিণত হবে। কেউ নিজেকে কল্পনা করছে একজন গবেষক হিসেবে, কেউ সফল উদ্যোক্তা, আবার কেউ হতে চায় দেশের দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে যে দৃঢ় অঙ্গীকারটি স্পষ্ট, তা হলো—তারা একটি স্বপ্নময় ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার কারিগর হতে চায়। তাদের স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং তা দেশ, সমাজ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত এক মহৎ প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ।
ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আরেক নবীন শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন ফেরদৌস তার অনুভূতি জানিয়ে বলেন,“কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া আমার জন্য অনেক বড় একটা অর্জন। পরিবারের সবার অনেক আশা আমার ওপর। আমি চাই শুধু ভালো ফলাফল নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলতে। এখানে এসে মনে হচ্ছে সত্যিই নিজের একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি। স্যার, ম্যাম বড় ভাইয়েরা অনেক ভালো,এবং তাদের ব্যবহারও অনেক ভালো। আমি আশা করি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সামনের দিন গুলো অনেক ভালো হবে ইনশাআল্লাহ।”
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন,
“আমি ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সেই সুযোগ করে দেবে এই বিশ্বাস নিয়েই এখানে এসেছি। শুধু নিজের জন্য না, দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই এগোতে চাই।”
তবে এই স্বপ্নভরা পথচলা সবসময় সহজ ও সমতল হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই অনেক নবীনকে কিছু কঠিন ও অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়। কখনো কখনো র্যাগিংয়ের মতো অমানবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ তাদের মনে ভীতি ও হতাশার ছায়া ফেলে। পরিচয়ের অজুহাত কিংবা শিখিয়ে দেওয়ার নামে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তা অনেক সময় কোমল হৃদয়ের স্বপ্নগুলোকে আঘাত করে দেয়।
একটি নতুন পরিবেশে যেখানে তাদের প্রয়োজন সাহস, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা—সেখানে ভয় ও অপমানের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে রসায়ন বিভাগের এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা চাই সিনিয়ররা আমাদের আপন করে নিক, ভয় দেখিয়ে নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত শেখার জায়গা, আতঙ্কের না। যদি সবাই সহযোগিতা করে, তাহলে এই জায়গাটা সত্যিই সুন্দর হয়ে উঠবে।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় কোষাধ্যক্ষ মহোদয় তার বক্তব্যে বলেন,” যে সকল নবীন শিক্ষার্থী মেধার স্বাক্ষর দিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে বা ভর্তি হয়েছে তাদেরকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তাদের আগামী পথ চলা যাতে সহজ হয় সেজন্য আজকে বিভিন্ন বিভাগ তাদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম করেছে সেজন্য বিভাগগুলোকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আজকে এই সময়ে এসে তারা বিভাগের সাথে পরিচয় হয়েছে, বিভাগের শিক্ষকদের সাথে পরিচিত হয়েছে, কারিকোলামের সাথে পরিচিত হয়েছে, তাদের লক্ষ্য স্থির করার জন্য কোন কোন কাজগুলো করা উচিত ইত্যাদি সম্পর্কে জেনেছে।” তিনি আরো বলেন,” আগামী বিশ্ব প্রতিযোগিতাপূর্ন বিশ্ব, এখানে টিকে থাকতে হলে বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে হবে।তারা যেন ভালো মন্দ দেখে চলে এবং তাদের জীবনে যেন ধর্ম চর্চার প্রভাব থাকে।”
সময়ের প্রবাহে এই অচেনা ক্যাম্পাসই একসময় হয়ে উঠবে আপন ঠিকানা। প্রথম দিনের লাজুকতা ও অস্বস্তি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে, আর তার জায়গায় জন্ম নেবে গভীর বন্ধুত্ব ও আন্তরিক সম্পর্ক। স্মৃতির ঝাঁপি ভরে উঠবে অগণিত গল্পে—কখনো হাসির, কখনো সংগ্রামের, কখনো সাফল্যের। রাত জেগে আড্ডা, একসাথে ক্লাস করা, পরীক্ষার চাপ ভাগাভাগি করা আর আনন্দ-বেদনার মুহূর্তগুলো মিলেই রচিত হবে জীবনের সবচেয়ে রঙিন ও স্মরণীয় অধ্যায়।
কয়েকটি বছর পেরিয়ে একদিন যখন এই নবীন মুখগুলিই বিদায়ের প্রান্তে এসে দাঁড়াবে, তখন তারা নিশ্চয়ই ফিরে দেখবে আজকের এই সূচনাক্ষণটিকে। মনে ভেসে উঠবে প্রথম দিনের পদচারণা, প্রথম পরিচয়ের উষ্ণতা, আর সাহস করে দেখা প্রথম স্বপ্নগুলোর কথা। তখন এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি পথঘাট, প্রতিটি ছায়াঘেরা বৃক্ষ নীরবে সাক্ষ্য দেবে তাদের বেড়ে ওঠা, সংগ্রাম আর সাফল্যের ইতিহাসের।
শুভকামনা তোমাদের প্রতি, হে নবীন ! তোমাদের পথচলা হোক আনন্দে ভরা, অর্জনে উজ্জ্বল। তোমাদের হাত ধরেই বাস্তব রূপ পাক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্বপ্ন। তোমাদের উপস্থিতিতে আরও গৌরবান্বিত ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক আমাদের প্রিয় এই প্রাঙ্গণ।









