দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে প্রচলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো হাতে নিয়েছে সরকার।
এই পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এর প্রায় অর্ধেক।
‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১’ শীর্ষক এই পরিকল্পনায় চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য ৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে আজ এই কৌশল অনুমোদনের কথা রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী।
বেসরকারি বিনিয়োগে জোর
নতুন কৌশলে রাষ্ট্রনির্ভর প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মোট বিনিয়োগ জিডিপির বর্তমান ৩১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কাঠামো অনুযায়ী, উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাবে। অন্যদিকে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সরকারের ধারণা, দ্রুতগতির বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও অবকাঠামোতে বড় পরিকল্পনা
পরিকল্পনায় ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়িয়ে দৈনিক ১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের উপযোগী করা হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির আওতায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একইসঙ্গে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
তিন ধাপে অর্থনৈতিক রূপান্তর
কৌশলগত কাঠামোতে অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য তিন স্তরের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বছরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পরবর্তী দুই বছর পুনরুজ্জীবনের এবং শেষ দুই বছর পুনর্গঠনের ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার বিষয়গুলোকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব
ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানিবিরোধী নীতি দূরীকরণ এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রণোদনা কাঠামো গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি ও ক্রীড়ায় নতুন উদ্যোগ
পরিকল্পনায় সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পে ২ লাখ তরুণকে দক্ষ করে তোলা এবং ৬৪ জেলায় সৃজনশীল হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ক্রিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের আওতায় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ১০০টি স্থানীয় চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান মুক্তির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্রীড়া উন্নয়নে ন্যাশনাল অলিম্পিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা, ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ এবং দেশজুড়ে ১ হাজারের বেশি খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর তাগিদ
কৌশলে দেশের দ্রুত ফুরিয়ে আসা জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই সুযোগের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ৭৬ লাখে পৌঁছাবে। ফলে আবাসন, কর্মসংস্থান ও জনসেবার ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জীবন্ত ডকুমেন্ট’ হিসেবে বাস্তবায়নের আহ্বান
কৌশল প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, এই কাঠামোকে কেবল একটি পরিকল্পনা নথি হিসেবে না দেখে বাস্তবায়নমুখী ‘জীবন্ত ডকুমেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের নীতি সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে এই কৌশলের সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে পরিকল্পনাটি কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।






