নিজস্ব প্রতিবেদক: পাহাড় সমান ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিটি এই ঋণ সুদে আসলে পরিশোধ করতে গিয়ে রিতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এছাড়াও খেলাপি ঋণে জর্জরিত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকে রাখা এফডিআর নগদায়ন বা উত্তলন করতে পারছে না বিকন ফার্মা। অর্থাৎ ব্যাংকটিতে এফডিআর করে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের অর্থ তছরুপ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিশোধিত মূলধন ২৩১ কোটি টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) কোম্পানির ব্যাংক লোন বা ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানির আকারের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেশি, যা কোনো ভাবেই স্বাভাবিক বিষয় নয়। এর ফলে বাজারে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করছে।
আরও জানা গেছে, বিশাল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে বিদায়ী বছরে কোম্পানির সুদজনিত ব্যয় (ফিন্যান্স এক্সপেনসেস) হয়েছে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৯৯ টাকা। আর গত বছর যা ছিল ১০০ কোটি ২৭ লাখ এক হাজার ১০৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে ৩৬ কোটি ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৭৯৬ টাকা বা ৩৬ শতাংশ। এই সুদজনিত ব্যয় বেশি না হলে কোম্পানির আয় আরও বাড়তো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বেশি মুনাফার আশায় সাধারণত কোম্পানিগুলো এফডিআর করে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিকন ফার্মার এফডিআর এর বিপরীতে সুদজনিত মুনাফা না বেড়ে বরং কমেছে ৪ লাখ ১২ হাজার ২৩৪ টাকা। গত বছর (৩০ জুন ২০২৪) কোম্পানিটির এফডিআর থেকে সুদ জনিত আয় হয়েছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৭৯৪ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এফডিআরের মুনাফা কমেছে ২৫ শতাংশ।
(বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের অনিয়ম নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে পরবর্তী পর্ব।)
জানা গেছে, অবসায়ন হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের এফডিআর করা আছে ১৪ লাখ এক হাজার ৩৮৫ টাকা। সম্প্রতি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া যে পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকও রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক থেকে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের এফডিআরের এই অর্থ আদৌ উত্তলন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, বিদায়ী বছরে কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু পার শেয়ার (এনএভিপিএস) ২৮ টাকা ৮৬ পয়সা হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিকন ফার্মার শেয়ার দর (প্রাইস) ছিল ১১২ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ এনএভিপিএস এর তুলনায় শেয়ার দর ২৮৯ শতাংশ বেশি।
সাধারণত যেকোনো কোম্পানির এনএভিপিএস যা থাকে শেয়ার দর তার কাছাকাছি বা তার চেয়ে একটু বেশি হলেও সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এনএভিপিএস এর তুলনায় সাথে শেয়ার দরের এই পার্থক্য নি:সন্দেহে অসামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক বেশি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারনা এবং তারা এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিদায়ী বছরে ফ্যাক্টরি ওভারহেডস-এ কর্মীদের চিকিৎসা বাবদ ব্যয় বেড়েছে ২৪০ শতাংশ। গত বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৫ লাখ ৯২ হাজার ২৬১ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ১৬ হাজার ৫৬২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৩০১ টাকা। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কর্মীদের চিকিৎসা বাবদ ব্যয় বাড়ানো হলেও গুরুত্বপূর্ণ ও মানবকল্যাণ মূলক কর্মকাণ্ড কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) খাতে বিকন ফার্মা বিদায়ী বছরে বরাদ্দ কমিয়েছে ৪৬ শতাংশ। অথচ এই খাতেই ব্যয় বাড়ানো উচিত ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির প্রয়াত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিম বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। এছাড়াও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কেলেঙ্কারীর সাথে এবাদুল করিম ও তার দুই সন্তান জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব ব্যাপারে জানতে কোম্পানির চেয়ারম্যান নুরুন নাহার করিম, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জালাল উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সচিব মো. ইমরোজ হোসেইনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমরা কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। আপনি নিউজ করে দেন।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানিয়ে দেওয়া হবে, যেন সঠিক তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিকন ফার্মা পুঁজিবাজারে এসেছে মূলত টাকা লুটপাট করার জন্য। কোম্পানির প্রয়াত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিমের মৃত্যুর পর তার ছেলেরাও পুঁজিবাজার থেকে অর্থ লুটপাট করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
উল্লেখ্য, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসে উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৩৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২১ দশমিক ৯৯ শতা্ংশ।





