জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যভোগ্য পণ্যের দাম

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই দেশের পরিবহন খাতে ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরকার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ালেও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বেড়েছে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যভোগ্য পণ্যের বাজারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে আগেই পরিবহন ব্যয় বেড়েছিল। গত ১৮ এপ্রিল মূল্যবৃদ্ধির পর তা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে যানবাহনের সংকট তৈরি হওয়ায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, মাছ, ডাল, তেল, চিনি—সব ধরনের পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে।

বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৮২–৮৫ টাকা এবং নাজিরশাইল ৮৮–৯৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় ৪–৬ টাকা বেশি। ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ১০ টাকা, ডিমের দাম পিসপ্রতি ২ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বেগুন ও শিমের মতো সবজি ১০০–১২০ টাকায় পৌঁছেছে। মাছের দাম কেজিতে ৪০–৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মসলার বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে—এলাচের দাম কেজিতে এক থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং জিরার দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি পরিবহন ব্যয়ই এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ।

বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়ার চিত্র
নওগাঁ থেকে ঢাকা রুটে ট্রাক ভাড়া ১৭–১৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকায় উঠেছে। একইভাবে যশোর থেকে ঢাকায় ভাড়া ২২–২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩০–৩২ হাজার টাকা হয়েছে। আর যশোর-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ৩০–৩৫ হাজার থেকে বেড়ে ৪০–৪৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে গন্তব্যভেদে ভাড়া ৭–৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে হিলি স্থলবন্দর থেকেও ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকেও ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রাক ভাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

মতভেদ ও উদ্বেগ
পরিবহন মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তবে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই ভাড়া বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছে। সংগঠনটির মতে, ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও ভাড়া ৩৫ শতাংশ বাড়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। এতে উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়ে, যার চূড়ান্ত চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।

সরকারের অবস্থান
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যমূল্যের ওপর বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে বাজার তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বাজার ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে।

শেয়ার করুন