শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম এখন দেশের অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধাণ সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং অঞ্চলটিতে তামাক চাষের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ আমদানি, চোরাচালান এবং নকল সিগারেট উৎপাদনের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এতে সরকার প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চট্টগ্রাম শুধু বিদেশি অবৈধ সিগারেটের প্রবেশদ্বার নয়, বরং এটি এখন পুরো দেশের জাতীয় বিতরণকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে। রিয়াজউদ্দিন বাজার, খাতুনগঞ্জ, চকবাজার ও লালখান বাজার থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদেশি এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি নকল সিগারেট পাইকারি ও খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে কসমেটিকস, প্লাস্টিক দ্রব্য, ফার্নিচার এমনকি কমলালেবুর ঘোষণার আড়ালে কোটি কোটি টাকার সিগারেট আনা হয়। গত ২১ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে ১৩৭ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির একটি চালান ধরা পড়ে, যেখানে ‘কাগজের চালান’ দেখিয়ে আনা হয়েছিল আসলে সিগারেট পেপার। এর কিছুদিন আগে ‘কমলালেবু’ ঘোষণার আড়ালে ১.২৫ কোটি স্টিক সিগারেট ধরা পড়ে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে তৈরি নকল সিগারেট ও ব্যান্ডরোল পুনর্ব্যবহার এখন চট্টগ্রামের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহেশখালী, আনোয়ারা, রাউজানসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে নকল সিগারেট কারখানা। বৈধ সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহৃত কর স্ট্যাম্প (ব্যান্ডরোল) খুলে তা অবৈধ উৎপাদনকারীদের কাছে বিক্রি করছেন কিছু তামাক বিক্রেতা। পরে এসব ব্যান্ডরোল পুনরায় ব্যবহার করে অবৈধ উৎপাদকরা তাদের পণ্যকে কর পরিশোধিত বলে উপস্থাপন করছে। ফলে তারা কর না দিয়েই বাজারে সিগারেট ছাড়ছে। অথচ প্যাকেটে ব্যান্ডরোল থাকায় সাধারণ ক্রেতারা সেটিকে বৈধ পণ্য বলে মনে করছেন।

স্থানীয় সূত্রে এর আগে জানা যায়, বিজয় ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো ও তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো নামের দুটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামেই এভাবে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে অবৈধ সিগারেট বাজারজাত করে আসছিল। শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানেই নয়, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান নামে-বেনামে সিগারেট তৈরি ও বাজারজাতসহ অবৈধ সিগারেট আমদানির সঙ্গে জড়িত।

নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার এখন এই অবৈধ বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি চালান পাঠানো হয়। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এসব সিগারেট বিক্রি করলে লাভ বেশি হয় এবং যেহেতু দাম সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম ৬০ টাকার চেয়ে কম, তাই ক্রেতারাও এগুলো বেশি কিনে। রিয়াজউদ্দিন বাজারের শরীফউদ্দিন তুহিন নামে এক বিক্রেতা বলেন, আমি প্রতি প্যাকেট ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি করে মুনাফা পাই, আর খালি প্যাকেট ফেরত দিলে কোম্পানি আমাকে অতিরিক্ত ৫ টাকা দেয়।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক গবেষণা বলেছে, বর্তমানে অবৈধ সিগারেট জাতীয় বাজারের প্রায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ দখল করে আছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩২ মিলিয়ন স্টিক অবৈধ সিগারেট বাজারে প্রবেশ করছে, যার ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট খাতে করহার বৃদ্ধি করা হলেও এর উল্টো প্রভাব পড়েছে। উচ্চ কর ও দামের কারণে আকাক্সিক্ষত রাজস্ব তো সরকার পাচ্ছেই না। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ ব্র্যান্ডের বিক্রি কমেছে, আর বাজার দখল করছে সস্তা অবৈধ ব্র্যান্ড। ফলে রাজস্ব আয়েও যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা বাড়তেই থাকবে বলে আশঙ্কা করা যায়।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক বলেন, অবৈধ সিগারেট শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। এসব পণ্যে মাননিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা ভ্যাট-কাস্টমসকে বিষয়টি অবহিত করব।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার মো. তারেক মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কনটেইনার আসে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগে ভুয়া ঘোষণার আড়ালে অবৈধ পণ্য আনার চেষ্টা করছে। অনেক বড় বড় অভিযানে অবৈধ সিগারেট জব্দ করেছি। আমরা কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছি। লোকাল পর্যায়ে আমরা কাস্টমস ভ্যাট ও কাস্টমস গোয়েন্দাকে তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছি।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে যেসব তথ্য আছে, সব জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে।

শেয়ার করুন