শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে দেশের শীর্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তমা গ্রুপের পাঁচটি এবং ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০১৮ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী (অডিট রিপোর্ট) তলব করা হয়েছে। এসব নথি সরবরাহের জন্য সম্প্রতি দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান টিমের প্রধান ও পরিচালক আবুল হাসনাত স্বাক্ষরিত চিঠি বিভিন্ন ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) পাঠানো হয়।

দুদক সূত্র জানায়, গত ১৮ জানুয়ারি পাঠানো চিঠিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান নথি সরবরাহ করেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগিরই পুনরায় তাগিদপত্র পাঠানো হবে।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। কমিশনের আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গ্রুপ দুটি তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও লাভ-লোকসানের তথ্য গোপন করে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন অডিট রিপোর্ট জমা দিয়েছে। ব্যাংক ঋণ গ্রহণের সময় ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উচ্চ মুনাফা দেখানো হলেও এনবিআরে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে লোকসানের তথ্য দেখানো হয়েছে। আবার আরজেএসসিতে সীমিত লাভ কিংবা লোকসানের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তমা গ্রুপের যেসব পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে সেগুলো হলো— তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, তমা কংক্রিট, তমা ট্যাক্সি, তমা প্রপার্টিজ এবং ভাটিকান প্রপার্টিজ লিমিটেড। পর্যায়ক্রমে গ্রুপটির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংগ্রহ করা হতে পারে।

এদিকে ম্যাক্স গ্রুপের যেসব ১০টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন তলব করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কুশিয়ারা পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড, ম্যাক্স পাওয়ার লিমিটেড, ম্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ম্যাক্সিনক্স লিমিটেড, ম্যাক্স সিকোসও, ম্যাক্স বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেড, ম্যাক্স প্রি-স্ট্রেস লিমিটেড, লুব হাউস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং আফা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

দুদক সূত্র আরও জানায়, রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম দফায় গঠিত অনুসন্ধান টিম কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তীতে একাধিকবার টিম পুনর্গঠন করা হয়। বর্তমানে পরিচালক আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি বিশেষ অনুসন্ধান টিম কাজ করছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৬ বছরে রেলওয়ের বড় বড় প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ছিল এই দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা বারবার বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি আমদানির নামে ভুয়া এলসি খুলে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

অনুসন্ধানে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও পরিচালক কানিজ ফাতেমা, তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া এবং তার সন্তান ও পরিচালক রাসনাত তারিন রহমান ও মুকিতুর রহমান। আদালতের মাধ্যমে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে রাজবাড়ী-টুঙ্গিপাড়া, পাবনা ঈশ্বরদী-ঢালারচর, দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং আখাউড়া-লাকসাম রেল প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিয়মের একাধিক তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার কাজ শেষ হতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

শেয়ার করুন