‘বাঁশ খাওয়া’ শব্দবন্ধটি আমাদের ভাষায় বিপদে পড়ার প্রতীক হলেও বাস্তবে বাঁশের কচি অংশ—কোঁড়—হতে পারে সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। পুষ্টিবিদদের মতে, সঠিকভাবে রান্না করা বাঁশের কোঁড় হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কম ক্যালোরি, বেশি ফাইবার ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানে ভরপুর এই খাবার ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঁশের কোঁড় রান্নায় ব্যবহার হয়ে আসছে। চীন, জাপান, কোরিয়া, উত্তর-পূর্ব ভারত ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি নিত্যদিনের খাবার। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হলে এই খাবার শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও ভুল রান্না মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কেন বাঁশের কোঁড় নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে?
ক্যামব্রিজের অ্যাংলিয়া রাস্কিন ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক লি স্মিথের মতে, বাঁশের কোঁড় দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ায় জনপ্রিয় হলেও এখন এটি বৈশ্বিক ‘সুপারফুড’ তালিকায় জায়গা পাওয়ার যোগ্য। তবে এর জন্য অবশ্যই সঠিক রান্নার নিয়ম মানতে হবে।
কলকাতার পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক বলেন, “অনেকেই জানেন না যে কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ বাঁশের কোঁড় শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এটি খাওয়ার আগে সচেতন হওয়া জরুরি।”
পুষ্টিগুণে ভরপুর বাঁশের কোঁড়
প্রতি ১০০ গ্রাম বাঁশের কোঁড়ে থাকে মাত্র ২৫–৩০ কিলোক্যালোরি শক্তি। অথচ এতে রয়েছে—
উচ্চমাত্রার ডায়েটারি ফাইবার
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটামিন ই
পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন
শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট
এছাড়া কোঁড়ে থাকা পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফাইটোস্টেরল শরীরের ভেতরে প্রদাহ কমাতে ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ফ্যাট প্রায় না থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটি আদর্শ খাবার।
শরীরের যেসব উপকারে আসে
হজমে সহায়ক: কোঁড়ের ফাইবার অন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে: কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখে: পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং কোলেস্টেরল কম থাকায় হার্টের উপর চাপ পড়ে না।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে: কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের কারণে ডায়াবেটিস রোগীরাও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এটি খেতে পারেন।
প্রদাহ কমাতে কার্যকর: অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
ভুল রান্নায় বিপদের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁশের কোঁড়ে থাকা ট্যাক্সিফাইলিন নামের যৌগ শরীরে গিয়ে সায়ানাইডে রূপ নিতে পারে। কাঁচা বা ঠিকমতো সেদ্ধ না করা কোঁড় খেলে বমি ভাব, মাথাব্যথা, পেটব্যথা, শ্বাসকষ্ট এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিরাপদে খাওয়ার নিয়ম
বাঁশের কোঁড় খাওয়ার আগে অবশ্যই—
খোসা সম্পূর্ণ ছাড়াতে হবে
ছোট টুকরো করে কাটতে হবে
ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে
সেদ্ধ করার পানি ফেলে দিতে হবে
এরপর রান্নায় ব্যবহার করতে হবে
অনেকে সেদ্ধ করার পর কোঁড় কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখেন বা ফারমেন্ট করেন, এতে ক্ষতিকর উপাদান আরও কমে।
সঠিক নিয়ম মেনে রান্না করলে যে বাঁশকে আমরা বিপদের প্রতীক ভেবে এসেছি, সেই বাঁশের কোঁড়ই হয়ে উঠতে পারে সুস্থ ও সচেতন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এক কথায়, প্রাকৃতিক ‘সুপারফুড’।









