ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি টেকনো ড্রাগস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরপরই ব্যবসায়িক চাপে পড়তে শুরু করেছে। শুধু মুনাফা ও বিক্রয় রাজস্ব কমাই নয়, কোম্পানিটি প্রফিটের নির্ধারিত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের না দিয়ে আয়কর আইনও লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, টেকনো ড্রাগস ২০২৪ সালের মধ্যভাগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির আগে ৩০ জুন ২০২৪ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ২৮ কোটি ৬ লাখ ২ হাজার ৫০৯ টাকা। তালিকাভুক্তির পরবর্তী অর্থবছর, অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত বছরে নিট মুনাফা নেমে আসে ২৩ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার ৮১০ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৯ টাকা, যা প্রায় ১৭ শতাংশ।
মুনাফা কমার পাশাপাশি লভ্যাংশ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার ৩০ শতাংশ লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার ২৪৩ টাকা। তবে বাস্তবে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের দিয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৮৮ টাকা। নিট প্রফিটের অবশিষ্ট ১৮ কোটি ২৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮২২ টাকা রিটেইন্ড আর্নিংসে রেখে দেওয়া হয়েছে।
২০১৯–২০ অর্থবছরের আয়কর পরিপত্র অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ হিসেবে দিতে হবে। এই হার পূরণ না হলে, রিটেইন আর্নিংসে রাখা বা কোম্পানিতে সংরক্ষিত সম্পূর্ণ অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। সে হিসেবে টেকনো ড্রাগসের সরকারকে দেওয়ার কথা ১ কোটি ৮২ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮২ টাকা, যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে কোম্পানিটি আয়কর আইন লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে তারল্য সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে কোম্পানিটিতে। ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরের ঘোষিত লভ্যাংশের শতভাগ এখনো বিতরণ করতে পারেনি টেকনো ড্রাগস। কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই অর্থবছরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত লভ্যাংশের অবশিষ্ট ৯৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৫ টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
কোম্পানিটির এমন অবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে মুনাফার পাশাপাশি বিক্রয় রাজস্বেও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। সমাপ্ত অর্থবছরে টেকনো ড্রাগসের বিক্রয় রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৩৩৭ কোটি ৫৬ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬২ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ১৯৬ টাকা। এক বছরে বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ২৩ কোটি ৭৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৩৪ টাকা বা প্রায় ৭ শতাংশ।
একই সঙ্গে কোম্পানিটির অ্যাকাউন্টস রিসিভেবলস বা পাওনা অর্থও বেড়েছে। ৩০ জুন ২০২৪ সমাপ্ত অর্থবছরে রিসিভেবলস ছিল ৯৫ কোটি ৮৯ লাখ ৬৩ হাজার ৫১৫ টাকা, যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার ২০৯ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে রিসিভেবলস বেড়েছে ১৮ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৯৪ টাকা বা ১৯ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো রিসিভেবলস বাড়িয়ে কাগজে-কলমে মুনাফা বেশি দেখানোর চেষ্টা করে। তবে টেকনো ড্রাগস রিসিভেবলস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও মুনাফা বাড়াতে পারেনি, যা কোম্পানিটির ব্যবসায়িক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।
এছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে (ডব্লিউপিপিএফ) জমা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ৭ কোটি ৩৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫৭৯ টাকা এখনো কোম্পানির কাছেই রয়েছে। কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কর-পূর্ববর্তী মুনাফার ৫ শতাংশ কর্মচারীদের কল্যাণে ডব্লিউপিপিএফে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ফলে টেকনো ড্রাগস একদিকে যেমন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করেছে, অন্যদিকে নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে টেকনো ড্রাগসের কোম্পানি সচিব দেবাশীষ দাস গুপ্ত বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ১০ শতাংশ লভ্যাংশ এজিএমের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে; ফলে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ঘোষিত লভ্যাংশের বড় অংশ ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ৯৬ লাখ টাকা শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ত্রুটি ও অন্যান্য কারণে অপরিশোধিত রয়েছে, যা দাবি অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে।
রিসিভেবল বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, মোট ১৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৫ কোটি টাকা সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে টেন্ডার সেলস বাবদ বকেয়া রয়েছে। এ অর্থ দ্রুত আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা না হওয়া অবশিষ্ট অর্থ দ্রুত জমা দেওয়া হবে।
সেলস কমার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় টেন্ডার সেলস কম থাকায় মোট বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে। তবে বিক্রয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কোম্পানি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। আইসিএবি নির্ধারিত হওয়ায় কোম্পানির কার্যক্রমের ভলিউম বৃদ্ধির সঙ্গে অডিট ফিও বেড়েছে। এছাড়া আগের বছর এজিএম-সংক্রান্ত ব্যয় অন্যান্য খরচের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও চলতি বছরে তা পৃথক শিরোনামে দেখানো হয়েছে।
তালিকাভুক্তির পর আর্থিক অবস্থার অবনতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সেলস কমার পাশাপাশি ফাইন্যান্স কস্ট ও অন্যান্য ব্যয় বাড়ায় নেট প্রফিট কমেছে। ব্যাংক ইন্টারেস্ট কম থাকায় আদার ইনকামও হ্রাস পেয়েছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতির জন্য কোম্পানি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
টেকনো ড্রাগস ২০২৪ সালের জুনে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিটি শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ করা হয় ৩৪ টাকা। এর ৩০ শতাংশ কমিয়ে, অর্থাৎ ২৪ টাকা দরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বুধবার (২১ জানুয়ারি) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ারটি সর্বশেষ ৩১ টাকা ৭০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৬২ দশমিক ৭১ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫ দশমিক ০১ শতাংশ এবং বাকি ৩২ দশমিক ২৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছে ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড ও ইবিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।









