আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করাই সরকারের মূল দায়িত্ব। তিনি বলেন, “এটি জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের লক্ষ্য এই নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক অর্জনে পরিণত করা, যা ভবিষ্যতের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। “১২ ফেব্রুয়ারি যেন কোথাও কোনো গলদ না থাকে। ২০২৬ সালের নির্বাচন এমন হতে হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার মানদণ্ড নির্ধারণ করবে,”—বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতির ধাপ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সবাইকে একযোগে ও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্বাচনে কমান্ড ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে এবং কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হবে।
বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে তা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। “তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে, আমাদেরও তেমনি দায়িত্বশীল হতে হবে,”—বলেন তিনি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা করে ড. ইউনূস বলেন, এখন পর্যন্ত পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন, কেউ এই পরিবেশ নষ্ট করবে না।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বড় পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে।
তিনি জানান, আজ মধ্যরাত থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে। সাইবার স্পেসে অপতথ্য ও গুজবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তার মন্ত্রণালয় প্রস্তুত রয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক জানান, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে, যাতে প্রিজাইডিং অফিসার ও ভোটপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবে। স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে যাবে এবং ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তুতিও রয়েছে।
সভা শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, নির্বাচন সামনে রেখে নিয়মিত বিরতিতে এমন সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।





