শুক্রবার, ২৭শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আমার প্রিয় বই

রাশিদুল আলম শিমুল : কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আলী ইদ্রিস এর সপ্তম গ্রন্থ “আমার প্রিয় বই অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ এ প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে আলী ইদ্রিস “আমার প্রিয় বই” এর ভেতরের লেখাগুলোর মূল উপজীব্য বিশেষ ব্যক্তিদের স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তারা হলেন আবু তাহের, ড. অনুপম সেন, ড. দিলওয়ার হোসেন, ড. মনিরুজ্জামান, উমরতুল ফজল, ওহীদুল আলম, মোসাম্মৎ সেলিমা বেগম, জিয়া হায়দার, আ.ফ.ম. সিরাজ উদদউলা চৌধুরী, অমলেন্দু বিশ্বাস, ড. শামসুল আলম সাঈদ, অরুণ দাশগুপ্ত, মোবাশ্বের আলী, ড. আবুল কাশেম চৌধুরী, আবদুল হক চৌধুরী, অধ্যাপত যতীন সরকার, ইমদাদুল হক মিলন, আলাউদ্দিন আল আজাদসহ দেশবরেণ্য অসংখ্য গুণীজনের স্বাক্ষাৎকারগুলো নিয়েছিলেন। সেই সময়ে চট্টগ্রাম থেকে বের হওয়া বহুল আলোচিত একটি দৈনিক পত্রিকা ছিলো “দৈনিক পূর্বকোণ”। পূর্বকোণের সাহিত্য পাতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো “আমার প্রিয় বই” নামে সাহিত্য পাতা। তখন সময় ১৯৮৫-৮৬ সাল । তরুণ লেখক আলী ইদ্রিস সাহিত্য পাতার খোড়াকগুলো সমস্ত দেশ ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেন। এত বছর ধরে তিনি লেখাগুলো সংরক্ষণ করেছেন যা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়।

বইটির ভূমিকা লিখেছেন সনামধন্য লেখক শিশির দত্ত। তিনি তার ভূমিকায় লিখেছেন-
তখন সময়টা ছিল অন্যরকম।
চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণ-এর সাহিত্য পাতা দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল। দেশের প্রধান লেখকরা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কবি-সাহিত্যিকরা নিয়মিত সাহিত্য পাতার জন্য লেখা পাঠাতেন। বলা চলে দেশের প্রধান কয়েকটি সাহিত্য পাতার একটি হয়ে উঠেছিল এই পূর্বকোণের সাহিত্য পাতা। কোনো কোনো সময় সাহিত্য পাতার কাটতি বেশি ছিল বলে কিছু কিছু সংখ্যা বেশি ছাপা হতো। একদিকে যেমন পাঠকের আগ্রহ ছিল তেমনি লেখকদেরও প্রিয় পাতা হয়ে উঠেছিল দৈনিক পূর্বকোণের সাহিত্য পাতা। এই কাগজের আরও একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাতদিনে সাতটি ফিচার পাতা। পাশাপাশি পাক্ষিক পূর্বকোণ বিনোদন ও রবিবার নামে পৃথক দুটো বিশেষ পাতাও নিয়মিত প্রকাশিত হতো। লেখকগণ প্রকাশিত লেখার জন্য সম্মানী পেতেন। এর কোনো এক সময়ে আলী ইদ্রিসের সাথে পরিচয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র সম্ভবত ১৯৮৫-৮৬ সালে। লিখতে চান পূর্বকোণের সাহিত্য পাতায়। কয়েকটি লেখা ছাপা হয়। পরে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সাহিত্য পাতায় ‘আমার প্রিয় বই’ শীর্ষক সাক্ষাৎকার ভিত্তিক কলাম লেখার। তখন নিয়মিত লিখেছেন এই কলাম। যা আজ থেকে প্রায় চৌত্রিশ বছর আগের কথা। এই জাতীয় নতুন নতুন বিভিন্ন ধরনের নানা কিছু পূর্বকোণে প্রকাশিত হয়েছে যা সহজেই সিরিজ আকারে গ্রন্থবন্দী হতে পারতো। উদ্যোগ কিংবা যথাযথ আর্কাইভ না থাকায় তা আর হয়ে উঠেনি।
আলী ইদ্রিসকে এক্ষেত্রে এক ব্যতিক্রমী বলা চলে। তিনি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা তখনকার লেখাগুলোকে একত্রিত করে একটা প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাকে ধন্যবাদ জানাই। ‘চন্দ্রবিন্দু’কে অভিনন্দন।
আলী ইদ্রিস আমাকে জানিয়েছেন: ‘আমার প্রিয় বই’ সিরিজটি আপনারই চিন্তা থেকে এসেছিল। আপনারই সযত্ন পরিচর্যায় প্রকাশিত হতো। ৩৪ বছর আগের সেই দিনগুলো এখনো তাজা গোলাপের মতোই সুরভিত।’
এখানে শুধু প্রিয় বই সম্পর্কে নির্বাচিত ব্যক্তিরা বলেছেন তা নয়। পাশাপাশি সেই সময় এবং তখনকার পাঠক মনস্কতার অনেককিছুই এখানে উঠে এসেছে।
গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। সেই সময়ের গুণী ব্যক্তিত্ব ও লেখকদের প্রিয় বই সম্পর্কে আলোচনায় উঠে এসেছে বিশ্ব সাহিত্যের নানা দুর্লভ গ্রন্থের কাহিনি কিংবা পাঠের অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে প্রিয় গল্প-উপন্যাসের চরিত্র, যা সত্যিকার অর্থে বলা চলে নানা জীবনবোধের প্রতিফলনের এক অনন্য সৃষ্টি। জীবনের এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনাময় অভিব্যক্তির অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে, যা বই-প্রিয় মানুষদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।
এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ১৮ জন লেখকের মধ্যে মাত্র দুই জন জীবিত আছেন। তাই মতামত ও অভিব্যক্তিগুলো অন্য কোথাও সন্নিবেশিত না হওয়ায় এর একটা দালিলিক গুরুত্বও রয়েছে। সেই দিক থেকে এই গ্রন্থটি বেশ মূল্যবান। আশা করি গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে।

সেই সাথে বইটি নিয়ে লেখক আলী ইদ্রিস স্যার তার ব্যক্তিগত কথায় লিখেছেন –
১. বিয়াল্লিশ বছর আগে ১৯৮৪ সালে আমি চট্টগ্রামে পৌছি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহাজালাল হল আর চট্টগ্রাম শহরের জামালখানে কেটেছে আমার এক যুগেরও বেশি সময়। ৩৩ বছর আগে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ (এক জনমে অতীন্দ্রিলা মৈত্রী প্রকাশনা, চট্টগ্রাম, ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩) প্রকাশিত হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে। বইটির ভূমিকা অংশে উল্লেখ করেছিলাম:
‘… মোতালেব ভাই-ই দশ বছর আগে আমাকে চাটগাঁ নিয়ে আসেন। একটা দ্বিতীয় ভুবন গড়ে ওঠে আমার। চাটগাঁ না এলে বোধহয় কোনোদিনই লেখক হয়ে উঠতাম না আমি। চাটগাঁর উদার প্রকৃতি, নৈসর্গিক আনন্দ এবং চট্টলচিত্তভূমির প্রাণবান মানুষগুলো আমাকে চিরকালের দোসর করে নিয়েছে।’
দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই প্রিয় চট্টগ্রাম থেকেই আমার সপ্তম গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে। এই আনন্দভাষ্য অবর্ণনীয়।
২.
বিপুল উদ্যমে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত হয়। প্রথিতযশা সাংবাদিক কে.জি মুস্তফা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঝকঝকে ছাপা হওয়া জাতীয় মানের এই পত্রিকাটি সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম পিটিএস (ফটো টাইপ সেটার) পত্রিকা। দৈনিক পূর্বকোণ তখন সাহসী মানুষের মিলন মেলা, বহু গুণী মানুষের আনন্দ ঠিকানা। কারণে-অকারণে যখন-তখন আমরা যেতাম পূর্বকোণে। আদরে-আপ্যায়নে যত্ন-সৌরভে ভরে থাকতো মন।
পূর্বকোণের সূত্রেই নিত্যনতুন লেখা, পরিকল্পনা আর আড্ডায় মশগুল থাকা- সে এক সোনার মোহর আঁটা সময় গেছে আমাদের জীবনে। কতো গুণী মানুষেরই না আমরা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এইসব মনীষীদের সাথে অফুরন্ত আড্ডায় অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ‘বই’ উঠে আসত। বই পড়ার স্মৃতি, বইয়ের সান্নিধ্য, বই হারাবার গল্প ইত্যাদি থেকেই সম্ভবত পূর্বকোণের সাহিত্য সম্পাদক শিশির দত্ত বই সংক্রান্ত চিন্তাসূত্রটি গ্রহণ করে থাকবেন। তিনি আমাদের দেশের গবেষক, পণ্ডিত, লেখক, অধ্যাপক; সর্বোপরি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কীর্তিমান মানুষদের পাঠের জগতের সাথে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি সারাদেশের কীর্তিমান মানুষদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত একটি তালিকা আমার হাতে তুলে দেন।
৩.
বি.সি.এস পরীক্ষা দিয়ে আমি ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আপাতত ছুটি। হাতে কোনো কাজ নেই, এই অবস্থায় সারা দেশ ঘুরে বেড়ানোর এবং গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার এই আকর্ষণীয় কাজের প্রস্তাবটি আমাকে মুগ্ধ করে। আমি দায়িত্বটি গ্রহণ করি। তালিকা অনুযায়ী যোগাযোগ স্থাপন করে তাঁদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি দেখা, বই সম্পর্কে তাদের মন্তব্য, পাঠের জগৎ, দুর্লভ কোনো বই সংগ্রহে থাকলে তার পরিচিতি, নবীন প্রজন্ম বই বিমুখ হয়ে যাচ্ছে কি-না এই বিষয়ে মন্তব্য, বই কেনার জন্য মাসিক বা বার্ষিক বাজেট ইত্যাদি জেনে এসে পূর্বকোণের পাতায় অভিজ্ঞতা বিবৃত করা- যা প্রচলিত ধারার কোনো সাক্ষাৎকার নয়।
সেই সময়ে কৃতীদের সাথে যোগাযোগ করা সহজ ছিল না। বাসায় টেলিফোন থাকলে শিশির দা ফোন করে সময় নিতেন। কখনো কখনো চিরকুট লিখে আমার হাতে দিতেন। আমি চিরকুট নিয়ে সাক্ষাৎদাতার কাছে হাজির হতাম। কাঙ্ক্ষিতজনকে না পেলে দরজার নিচ দিয়ে চিরকুট ফেলে আসতাম। প্রত্যেকটি সাক্ষাৎকারের আলাদা আলাদা এবং চিত্তাকর্ষক গল্প আছে।
8.
১৯৯২ সালের ২০ নভেম্বর ‘আমার প্রিয় বই’ সিরিজের প্রথম কিস্তি ছাপা হয়। খুব ভয়ে ভয়ে শুরু করলেও লেখাটি ছাপা হতে শুরু করলে খুব আনন্দ ও প্রশংসা পেয়েছিলাম। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে চাকুরিতে যোগ দিতে আমি চট্টগ্রাম ছেড়ে বগুড়ায় চলে যাই। সংগৃহীত বাকি সাক্ষাৎকারগুলো প্রস্তুত করে আর পূর্বকোণে পৌছাতে পারি না। মাহমুদ শাহ কোরেশী, ড. জামাল নজরুল ইসলাম, সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, সুচরিত চৌধুরী, ড. সফিউদ্দিন আহমেদ, মর্তুজা বশীর, ড. আবুল আহসান চৌধুরী, শামসুল হোসাইন প্রমুখকে নিয়ে খসড়া লেখাগুলো চিরকালের মতোই হারিয়ে যায়।
সমুদ্র শহর চট্টগ্রামের সেই শুক্রবারগুলো আমার জন্য বিশেষ আনন্দ নিয়ে আসতো। জামাল খানের শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ সড়কের ৮৪নং বাসাটিতে পূর্বকোণই হতো আমার আলো-মাখা প্রথম সকাল। অপার সেই আনন্দধ্বনি এখনো বুক পেতে শুনি।
৫.
ধূলি ধূসরিত সময়ের পৃষ্ঠা উল্টে সেই উজ্জ্বল সময়ের স্মৃতিচিত্র বই হিসেবে উপস্থাপন করলেন ‘চন্দ্রবিন্দু’র প্রকাশক স্নেহভাজন মঈন ফারুক। তাকে অনিঃশেষ ভালোবাসা জানাই। বইটির ভূমিকা লিখে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করলেন কবি ও বিশিষ্ট নাট্য সংগঠক প্রিয় শিশির দত্ত। ‘আমার প্রিয় বই’টি আমার ‘দ্বিতীয় জন্মভূমি’ চট্টগ্রামের সাথে আমাকে নতুন ভালোবাসায় অভিষিক্ত করলো।

রাশিদুল আলম শিমুল
১৫ মার্চ ২০২৬

শেয়ার করুন