পর্ষদহীন ইসলামী ব্যাংকে অচলাবস্থার শঙ্কা

দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে পরিচালনা পর্ষদ ও চেয়ারম্যান ছাড়াই চলছে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একই সঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদও চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের এ ব্যাংকে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের জুনের শুরু থেকে ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়। গ্রাহকদের ধারাবাহিক বিক্ষোভ, আন্দোলন এবং আমানত তুলে নেওয়ার প্রভাবে ব্যাংকটি তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়। তবে সংকট কাটাতে না পেরে গত ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটির যাবতীয় সিদ্ধান্ত প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

নীতিনির্ধারণী সংকট ও অস্থিরতার প্রভাব ব্যাংকটির আর্থিক সূচকগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ব্যাংকের প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা। প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ লোকসান ছিল ২৭৪ কোটি টাকা।

ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে পরিচালন লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট লোকসান ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের আমানত স্থিতি ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আমানত কমেছে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে অনাদায়ী মুনাফা যুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটির বিতরণকৃত বিনিয়োগ (ঋণ) স্থিতি বেড়েছে। এতে ঋণ-আমানত অনুপাত আরও অবনতির দিকে গেছে।

ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কয়েকজন শাখা ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান ও পূর্ণ ক্ষমতার ব্যবস্থাপনা পরিচালক না থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। চলতি মূলধনের অনুমোদন, ঋণ নবায়ন, পুনঃতফসিল, আমদানি ঋণপত্র খোলাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন বলেন, পর্ষদ না থাকায় করপোরেট গ্রাহকদের আমানত সংগ্রহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ থাকলে এ ধরনের গ্রাহকরা বেশি আস্থা পান। তবে ব্যাংকের অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে এবং বিনিয়োগগ্রহীতাদের চাহিদাও যথাসম্ভব পূরণ করা হচ্ছে।

তবে ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি কিংবা প্রতিপূরক ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। অনেকের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনও পাওয়া যাচ্ছে না।

তৈরি পোশাক খাতের এক ব্যবসায়ী বলেন, চলতি মূলধনের অভাবে তার কারখানার প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণপত্র খুলতে না দেওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের প্রায় ২ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ঋণপত্র-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আলতাফ হুসাইন বলেন, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাচ্ছে, সেটি দিয়েই আমদানির ঋণপত্র খোলা হচ্ছে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে, তবে ধীরে ধীরে এ সংকট কাটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। সে সময় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। পরে তার স্থলাভিষিক্ত হন অধ্যাপক এম জুবাইদুর রহমান।

চলতি বছরের ২৪ মে তাকে সরিয়ে সাবেক উপ-গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের একাংশ আন্দোলনে নামে এবং ব্যাপক হারে আমানত উত্তোলন শুরু হয়। এতে তারল্য উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যেই সংকটে পড়ে যায়।

নতুন পরিচালনা পর্ষদ কবে গঠন করা হবে-এ বিষয়ে প্রশাসক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি।

প্রশাসক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, পরিচালনা পর্ষদ দেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তারা উপযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজ করছেন। ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন এখন স্বাভাবিক রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। আতঙ্কে যারা আমানত তুলে নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আবার ফিরে এসেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ নতুন পর্ষদ গঠনের কাজ করছে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। ভালো গ্রাহকদের খেলাপির ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, পর্ষদের সব ক্ষমতা বর্তমানে প্রশাসকের ওপর ন্যস্ত রয়েছে এবং কোনো গ্রাহক সমস্যায় পড়লে তা দেখার ব্যবস্থা রয়েছে।

চলতি বছরের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের আমানত ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা এবং বিতরণকৃত বিনিয়োগ (ঋণ) ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিতরণকৃত এ ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ব্যাংকটি থেকে বের করে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

শেয়ার করুন