শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আইন লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালাচ্ছে বিএটিবিসি

বাংলাদেশে সিগারেটের প্রচারণার বিদ্যমান কঠোর আইন থাকার পরও সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) আইন লঙ্ঘন চালাচ্ছে প্রচারণা। নতুন পণ্য বাজারে আনার সঙ্গে সঙ্গে দেশের নানা স্থানে গোপনে আয়োজন করা হচ্ছে প্রচারমূলক ইভেন্ট, উপহার বিতরণ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্র্রতি একটি ভিডিওর মাঝে দেখা যাচ্ছে তারা ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রাহক ও দোকানদারদের কাছে প্রচারণা করছে।

২০০৫ সালের তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন এবং ২০১৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ী এসব কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, বাস্তবে তা কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে তরুণ সমাজের মধ্যে তামাকের প্রতি আকর্ষণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা “তামাকমুক্ত বাংলাদেশ ২০৪০” লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উক্ত আইনে, কোনো তামাকজাত পণ্যের সরাসরি বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন, প্রচার, ছাড় বা উপহার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গণমাধ্যম, দোকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা যেকোনো ইভেন্টে তামাক ব্র্যান্ড বা লোগো প্রদর্শন দণ্ডনীয় অপরাধ। তামাক কোম্পানি সিএসআর  কার্যক্রমের আড়ালে তাদের ব্র্যান্ড প্রচার করতে পারবে না।

তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব নিয়ম প্রায়ই উপেক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন তামাক কোম্পানি “ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশন”, “লাকি ড্র”, “লাউঞ্জ ইভেন্ট” কিংবা “লাইফস্টাইল ক্যাম্পেইন”-এর নামে তামাক পণ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে। এই সব আয়োজনের মূল লক্ষ্য— নতুন প্রজন্মের মাঝে ধূমপান ও অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারকে “স্টাইল” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তামাক কোম্পানিগুলো বর্তমানে সরাসরি বিজ্ঞাপন না করে ‘গোপন মার্কেটিং’ কৌশলে কাজ করছে। যেমন— দোকানের কাউন্টারে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের বিশেষ ডিসপ্লে, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে ‘লাইফস্টাইল কনটেন্ট’, কিংবা জনপ্রিয় সঙ্গীতানুষ্ঠান ও স্পোর্টস ইভেন্টে ব্র্যান্ডের রঙ বা লোগো ব্যবহার করা। অনেক সময় এসব প্রচারণা সিএসআর প্রকল্পের ছদ্মবেশে চালানো হয়, যাতে আইনগতভাবে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রচারণা কৌশল সরাসরি তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের হার গত পাঁচ বছরে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শামীমা নাসরিন বলেন,তামাক কোম্পানিগুলো নতুনভাবে তরুণদের টার্গেট করছে। তারা তামাককে ফ্যাশন হিসেবে দেখাতে চাইছে। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দেশের তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আইন বাস্তবায়নে শিথিলতার বিরুদ্ধে সরব। তাদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে কোম্পানিগুলো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করছে।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক হাসান মেহেদী বলেন, তামাক আইন ভঙ্গের জন্য জরিমানার পরিমাণ বর্তমানে খুবই সামান্য। কোম্পানিগুলো সহজেই জরিমানা দিয়ে আবারও একই কাজ করে। তাই জরিমানার হার বাড়াতে হবে এবং বারবার আইন ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খালিদ হোসেন বলেন, তামাক কোম্পানির প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন বন্ধ না হলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর হার আরও বেড়ে যাবে। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের নয়, অর্থনীতির জন্যও ভয়াবহ।

শেয়ার করুন