মৃত্যুর দুয়ার থেকে বারবার ফিরে আসার অদম্য লড়াই

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভার কেয়ার হাসপাতালের (সাবেক অ্যাপোলো হাসপাতাল) ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড। হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় নীল রঙের কম্বলে বুক পর্যন্ত ঢেকে ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ।

কথা বলে জানা যায়, ৫৬ বছর বয়সের আফতাব উদ্দিন আহমেদের দুটো কিডনিই বিকল। তাকে নিয়মিত ডায়ালিসিস সেবা নিতে হয়।

২০০৭ সাল থেকে অর্থাৎ প্রায় ১৯ বছর ধরে সপ্তাহে তিনদিন এভাবেই ডায়ালিসিস করান।
আফতাব উদ্দিন বলেন, কিডনি বিকল হওয়ার পর থেকে খাবার দাবারসহ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ এবং অন্যান্য নিয়ম কানুন সঠিকভাবে মেনে চলেছি।

বেঁচে থাকার পেছনে আমার স্ত্রীর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক এবং নার্সদের অনেক অবদান আছে।
আফতাব উদ্দিন আহমেদের শুধু কিডনির বিকল সমস্যাই নয়, এই ১৯ বছরে আরও অনেক প্রাণঘাতী রোগকে হার মানিয়ে বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। করোনা মহামারিকালে তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি পাঁচবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন। জরুরিভাবে তাকে পাঁচবার আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় পাঁচবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার পরেও তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন।

আফতাব উদ্দিনের বাড়ি গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের মাওনায়। বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। আফতাবের বেঁচে থাকার পেছনে এবং এই দীর্ঘ ১৯ বছরের কঠিন যাত্রায় সব সময় পাশে থেকে সেবা করেছেন তার স্ত্রী কামরুন নাহার শিউলি। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক।

স্বামীর অসুস্থতা প্রসঙ্গে কামরুন নাহার শিউলি বাংলানিউজকে বলেন, ২০০৭ সালে আমার স্বামীরর অরুচি এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়। তখন আমরা স্থানীয় একজন মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে যাই। সেই চিকিৎসক দ্রুত ঢাকায় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায় তার দুটি কিডনিই বিকল। এরপর থেকেই তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয়।

তিনি আরও জানান, আমরা প্রথমদিকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের চেষ্টা করেছি। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা সম্ভব হয়ে উঠে নাই। ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতেও সে ভয় পায়। ডায়ালাইসিসটাই তার কাছে বেশি সুবিধার মনে হয়েছে। করোনা মহামারিকালে আমার স্বামীর কোভিড হয়। এছাড়াও পাঁচবার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। পাঁচবার তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে সে বেঁচে আছে।

আফতাবের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর যখন ডায়ালাইসিস শুরু হয়, তখন বয়স ছিল ৩৬, এখন তার বয়স ৫৬ বছর। আবার আমার বয়স ছিল তখন ৩০ বছর, এখন আমার বয়স ৫০ বছর। আমি তার জন্য আমার নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আমরা অনেক স্ট্রাগল করে এ পর্যন্ত এসেছি। আল্লাহ যেভাবে রেখেছে আমরা তাতে খুশি।

একই হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস এবং চিকিৎসা সেবা নেন নাম ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩৫ বছর বয়সের একজন। তার বয়স যখন ১৭ তখন থেকেই তিনি ডায়ালাইসিস সেবা নেন। এর মাঝে সে বিয়ে করেছেন এবং একটি কন্যা সন্তানের বাবাও হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমি জন্মগতভাবেই অসুস্থ, আমার ব্লাডার হচ্ছে নিউরোজেনিক ব্লাডার। আমার ১৭ বছর বয়স থেকেই আমি ডায়ালাইসিস শুরু করি। বর্তমানে আমার বয়স ৩৫ বছর। এছাড়াও আমার বিয়ের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। বর্তমানে আমার একটি সাড়ে তিন বছরের কন্যা সন্তান আছে।

মরিয়ম আক্তার লিপি নামে ঢাকার খিলগাঁও গোড়ানের বাসিন্দা ২০০৯ সাল থেকে ডায়ালাইসিস করে বেঁচে আছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, লিপির ডায়ালাইসিসের ১৮তম বছর চলছে এখন। তার কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় কিন্তু সফল হয় নাই। এভারকেয়ার হাসপাতালে গত ছয় বছর ধরে লিপির চিকিৎসা করছেন হাসপাতালটির নেফ্রোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. এবাদুর রহমান। তিনি রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব এডিনবরার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ২০ শতাংশ লোক কিডনি রোগে ভুগছেন। ২০ শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটির উপরে কিডনি রোগী আছে। এর মধ্যে ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এমন রোগীর এক লাখের বেশি হবে। বাংলাদেশে এত লোকের ডায়ালাইসিস দেওয়ার ফ্যাসিলিটি নাই। অনেকে আবার ডায়ালাইসিস খরচ বহন করার সামর্থ্যও নাই।

দেশে কিডনি রোগী বেড়ে যাওয়া কারণ প্রসঙ্গে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কিডনি রোগের মেইন কারণ হচ্ছে ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিসের কারণে বেশিরভাগ লোকের কিডনি নষ্ট হয়। এর সাথে আছে হাইপারটেনসিভ কিডনি ডিজিজ। এছাড়া কিছু রোগ আছে যেমন, কিডনি প্রদাহ। পাশাপাশি কম বয়সের বাচ্চাদের জন্মগত কিডনি রোগের কারণে কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমার জীবনে আমি ডায়ালাইসিসের রোগী দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে দেখছি ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ ৩৪ বছর। সেকেন্ড দেখছিলাম সৌদি আরবে রিয়াদে ২৮ বছর। বাংলাদেশে আমাদের এভার কেয়ার হাসপাতালে তিনজন রোগী আছে, একজন ২০ বছর, আরেকজন প্রায় ২০ বছরের কাছাকাছি। আরেকজন ১৮ বছর সম্পন্ন করেছেন। ১৮ বছরের যে রোগী, তার জীবন অনেক ডিফিকাল্ট, প্রথমে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হলো, ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হলো না, তারপর আবার ডায়ালাইসিস এবং এখনও সে ডায়ালাইসিস করে বেঁচে আছেন। এই তিনজন পেশেন্ট আমাদের বাংলাদেশে আমার মনে হয় সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ে বেঁচে থাকা রোগী। সাধারণত ডায়ালিসিস পেশেন্ট পাঁচ থেকে সাত বছরে মারা যায়।

অর্থাৎ সাধারণত ডায়ালাইসিস রোগীরা যে সময় পর্যন্ত বাঁচে উল্লেখিত তিনজনই সেই সময়ের দ্বিগুণ তিনগুণের বেশি সময় ধরে বেঁচে আছে। চিকিৎসকেরা বলছেন ডায়ালাইসিসের রোগীরা যদি নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে এবং চিকিৎসক নির্দেশিত নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে চলে তাহলে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা সম্ভব।

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে ডায়ালাইসিস কেন্দ্র প্রায় ১৪৬টি, যার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ঢাকায় অবস্থিত। সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ২৫টিতে প্রতি সেশন ৪০০ টাকায় ডায়ালাইসিস করা হয়। তবে চাহিদার তুলনায় দেশে ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা অপ্রতুল বলছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

কিডনি রোগীর দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে ডা. এবাদুর রহমান বলেন, আমাদের দেখতে হবে। ডায়ালাইসিসের ক্ষেত্রে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট কতটা ভালো। হাসপাতালের স্টাফ তারা কেমন অভিজ্ঞ। ইক্যুইপমেন্টগুলোর মান কেমন? ডায়ালাইসিস রোগীর হেপাটাইটিস বি অথবা সি ইনফেকশন হচ্ছে কি না? এই কয়েকটা জিনিস যদি ভালোভাবে মেইনটেইন করা যায়, তাহলে ফলাফল ভালো হবে। ডায়ালাইসিসের প্রথম তিন মাস খারাপ যায়, তারপর রোগীর শরীর যখন এটায় অ্যাডাপ্ট হয়ে যায়, তখন সমস্যা হয় না। দেরি করে ডায়ালাইসিস করাটাও খারাপ। যখন ক্রিয়েটিন ৪/৬ থাকে তখনই ডায়ালাইসিস শুরু করা উচিত। এসব রোগীর আয়ুষ্কাল বেশি হয়। ১০/১২ থেকে শুরু করলে সেই রোগী বেশিদিন বাঁচবে না।

তিনি আরও যোগ করেন, যারা খুব ভালোভাবে লাইফস্টাইল, হাইজিন মেইনটেইন করেছে, ডায়ালাইসিসের ইনস্ট্রাকশন মেনে চলেছে, তারা বেশিদিন সারভাইভ করে। ডায়ালাইসিস খরচ অনেক বেশি, যারা খরচ এবং অনান্য জটিলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে তারা দীর্ঘদিন বাঁচে।

দেশে কোন বয়সের কিডনি রোগী বেশি জানতে চাইলে ডা. এবাদুর রহমান বলেন, আমরা এখন যে রোগীগুলো পাচ্ছি, তাদের বেশিরভাগের বয়স ৪০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কনজেনিটাল কিডনি ডিজিজ বেশি পাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ইউরিন ইনফেকশনের রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। হাইজিন এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়ালিসিস যারা না করতে পারে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা ডায়ালিসিস করতে পারে না তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিটা হচ্ছে প্রথমত তার শরীরে পানি জমতে থাকে। পানি লাংসে চলে আসে তখন সিভিয়ার শ্বাসকষ্ট হয়। এই পেশেন্টগুলা আল্টিমেটলি মারা যায়। দ্বিতীয় হচ্ছে কিডনি থেকে পটাশিয়াম বেরোতে পারে না। এই পটাশিয়াম যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যাবে। ইউরিয়া যখন অনেক বেশি হয়ে যাবে তখন পেশেন্ট কোমাতে চলে যাবে। যখন একবার কিডনি ফাংশন পাঁচের নিচে চলে যায় তখন এই পেশেন্টগুলো আর বেশি দিন বাঁচে না। তখন এক থেকে তিন মাসের মধ্যে এই পেশেন্টগুলো মারা যায়।

দেশে কিডনি রোগীদের জন্য করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিডনি রোগীদের সরকার কিছু অনুদান প্রদান করে। এতে অ্যাটলিস্ট রোগীর কিছু উপকার হয়। কিন্তু প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে এটা কাভার করবে না। সরকারি হাসপাতালের ফ্যাসিলিটি লিমিটেড। তাদের হয়তো যে কয়টা মেশিন আছে, ওরা এতগুলো পেশেন্টকে সেবা দিতে পারে না। ডায়ালিসিস ফ্যাসিলিটি আমাদের বাড়াতে হবে। সরকার যদি এদিকে নজর দেয়, তাহলে দেশের কিডনি রোগীদের আমরা বাঁচাতে পারব। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ভালো প্রোগ্রাম থাকলে একটা পর্যায়ে এই রোগীগুলোকে আমরা ডায়ালাইসিস থেকে বাইরে নিয়ে আসতে পারব।

শেয়ার করুন