নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির আর্থিক প্রতিবেদনে আনরিয়েলাইজড লোকসানের পরিমাণে অসংগতি এবং ১৩৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ভ্যাট দাবিকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন, করসংক্রান্ত বিরোধ ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে আনরিয়েলাইজড লোকসানের পরিমাণ বিভিন্ন স্থানে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ফিন্যান্সিয়াল পজিশনের সাত নম্বর নোটে এ লোকসান দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৮২ লাখ ৭৭ হাজার ৭১ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি অংশে উল্লেখ করা হয়েছে ১৩ কোটি ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬১১ টাকা। অন্যদিকে, প্রফিট অ্যান্ড লস অংশে এর পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬৫ টাকা।
এ বিষয়ে এনএলআই সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহেদ ইমরান বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে আনরিয়েলাইজড লোকসানের অঙ্ক ভিন্ন হওয়ার বিষয়টি তাঁর কাছেও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত।
হযরত আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ইনচার্জ মো. জামাল হোসেনের মতে, আর্থিক প্রতিবেদনে একই বিষয়সংক্রান্ত অঙ্কের পার্থক্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
কোম্পানি সচিবের বক্তব্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি লরেন্স শ্যামল মল্লিককে সরিয়ে মো. আমিনুল হক ভূঁইয়াকে ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে ১ জুন লরেন্স শ্যামল মল্লিককে আবারও কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের অসংগতি নিয়ে জানতে চাইলে লরেন্স শ্যামল মল্লিক লিখিত বক্তব্যে জানান, সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) দেওয়া হয়েছে। তাই এ বিষয়ে তিনি আলাদাভাবে কিছু বলতে পারবেন না।
কোম্পানির আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৫ টাকা। আগের অর্থবছরে এ লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৬৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে লোকসান বেড়েছে ৯৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ টাকা।
তবে এ বিষয়ে লরেন্স শ্যামল মল্লিক দাবি করেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কোনো লোকসান হয়নি; বরং ৫৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। রিয়েলাইজড লোকসান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩৯ কোটি টাকার ভ্যাট দাবি
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে ভ্যাটসংক্রান্ত একটি বিরোধও রয়েছে। নিরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১২ মে ভ্যাট কর্তৃপক্ষ কোম্পানিটিকে ১৩৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দাবির বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
পরবর্তী সময়ে ২৫ মে কোম্পানিটি ওই দাবির বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করে দাবিকৃত অর্থ পুনরায় পর্যালোচনার অনুরোধ জানায়। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোম্পানি সচিব লরেন্স শ্যামল মল্লিক জানিয়েছেন, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
সিএসআর বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে বরাদ্দ ৭ লাখ ২৯ হাজার ৯৫০ টাকা কমেছে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের নেতা মো. সাজ্জাদুল হক বলেন, কোম্পানিটি ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
সংগঠনটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক প্রতিবেদনে অসংগতির বিষয়টি কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত।
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিশোধিত মূলধন ১০৭ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে কোম্পানিটির ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ শেয়ার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৩১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।





