রাশিদুল আলম শিমুল: আমাদের নদীগুলো শুধু পানি বহন করে না, বহন করে জনপদের গল্প। নদীর স্রোতের সঙ্গে বয়ে চলে লোকজ সংস্কৃতি, আর নদীর পাড় ঘিরে গড়ে ওঠে বসতি, হাট-বাজার, কৃষি ও মানুষের জীবিকা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কোনো নদী যখন তার স্রোত হারায়, তখন হারিয়ে যেতে বসে একটি অঞ্চলের বহু পুরোনো স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যও। ময়মনসিংহের বানার নদী সেই হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসেরই এক নীরব সাক্ষী।
একসময় বানার নদী ছিল এ অঞ্চলের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বর্ষা মৌসুমে নদীতে নৌকা চলাচল করত। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য নৌপথে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যেত। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মানুষের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতির নানা কর্মকাণ্ড। নদীর ঘাট ছিল মানুষের মিলনস্থল, আর নৌকা ছিল যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের সঙ্গে বানার নদীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নদীর পানি কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। নদীর পাড়ের জমি ছিল উর্বর। জেলে, মাঝি ও নৌযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের জীবিকা সরাসরি নির্ভর করত এই নদীর ওপর।

শুধু অর্থনীতি নয়, স্থানীয় সংস্কৃতিতেও বানার নদীর রয়েছে গভীর প্রভাব। নদীর তীর ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন আজও বহন করছে পুরোনো দিনের স্মৃতি। এর মধ্যে অক্ষয় তৃতীয়া উপলক্ষে বানার নদীর তীরে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী উত্তর বাহিনী মেলার কথাও উল্লেখযোগ্য।
নদীর পানি কমেছে, বদলে গেছে চারপাশের দৃশ্যপট। কিন্তু মানুষের ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে বানার নদীর সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। নদীর আশপাশের জনবসতির একটি বড় অংশ আজও মৃতপ্রায় বানারকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে।
জমিদারির ইতিহাসেও বানার
মুক্তাগাছার বানার নদীর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাসে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, মুক্তাগাছার জমিদাররা এই নদীপথে মুক্তাগাছায় এসে জমিদারির সূচনা করেছিলেন। অন্যদিকে মধুপুরের গহীন বনের হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে পূর্বপাড়ের মুক্তাগাছার মানুষের জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় হিসেবেও কাজ করত বানার নদী।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বানারের চেহারা। ১২৯৬ ও ১৩০৪ সালের ভূমিকম্পে বানার নদীসহ এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
নামের উৎস নিয়েও নানা কথা
বানার নদীর নামের উৎস নিয়েও স্থানীয় ইতিহাসে রয়েছে নানা মত। প্রাচীন বাংলার তাম্রশাসন-সংক্রান্ত আলোচনায় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্মণ সেনের ভাওয়াল তাম্রশাসনে ‘বানহার’ নদীর উল্লেখ রয়েছে। অনেকের মতে, প্রাচীন সেই ‘বানহার’ নামের বিবর্তিত রূপই বর্তমানের ‘বানার’।
এ ছাড়া নদী ও প্রাচীন জনপদের সঙ্গে আরব বণিকদের যোগাযোগের কথাও স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়। তবে ‘বানার’ নামটি সরাসরি আরব বণিকদের দেওয়া—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি ইতিহাস ও লোকস্মৃতির সংযোগস্থলে থাকা একটি আকর্ষণীয় অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
পলি ও দখলে অস্তিত্ব সংকটে
বর্তমানে পলি জমে বানার নদীর তলদেশ অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে সংকুচিত হয়েছে নদীর প্রশস্ততা। কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহ এতটাই কমে গেছে যে বর্ষা ছাড়া নদীর পুরোনো রূপ কল্পনা করাও কঠিন। এর সঙ্গে নদী দখল ও দূষণের মতো সমস্যাও বানারের স্বাভাবিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে একটি নদী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি জলধারা হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ, কৃষি, মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন-জীবিকা।
তাই বানার নদীকে বাঁচাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। প্রথমেই নদীর প্রকৃত সীমানা ও পুরোনো প্রবাহপথ চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নদী খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পানিপ্রবাহ সচল রাখা এবং নদীর তীর সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
বানার হয়তো আর আগের মতো স্রোতস্বিনী নেই। কিন্তু নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখনো অনুভব করা যায় অতীতের সেই জলপথের অস্তিত্ব। প্রবীণদের স্মৃতিতে, পুরোনো নদীখাতে এবং নদীকে ঘিরে থাকা স্থানীয় ঐতিহ্যে বানার এখনো বেঁচে আছে।
স্রোত হারিয়েছে বানার, কিন্তু হারায়নি তার ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বাঁচাতে হবে নদীকেও।









