দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসির বিরুদ্ধে হিসাবের শ্রেণিবিন্যাসে অনিয়ম, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, করপোরেট সুশাসনে ব্যর্থতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ না করার অভিযোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কমিটিকে প্রাথমিকভাবে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। তবে সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। পরে তদন্ত শেষ করার জন্য কমিটির সময় আরও বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তালিকাভুক্ত একটি বড় কোম্কানির বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট সুশাসনসংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে কেন। একই সঙ্গে বর্ধিত সময়ের মধ্যে তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন কবে কমিশনে জমা পড়বে, সেদিকেও নজর রয়েছে বিনিয়োগকারীদের। বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের অধীন ইনস্কেকশন, এনকোয়ারি অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ গত ২৫ মার্চ (২০২৬) এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধান আদেশ জারি করে।
আদেশে বলা হয়, পুঁজিবাজার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেছে কমিশন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিএসইসির এক হাজারতম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২১ ধারায় অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অনুসন্ধান চলাকালে রবি আজিয়াটা কমিটির কাছে নিজেদের বক্তব্য, ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেওয়ার সুযোগ পাবে।
বিএসইসির তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয় রবি আজিয়াটার ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব। অভিযোগ রয়েছে, ওই দুই বছরে কোম্কানিটির কিছু পরিচালন ব্যয় বা অপারেটিং এক্সপেন্ডিচার (ওপেক্স) যথাযথভাবে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তা মূলধনি ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (ক্যাপেক্স) হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে।
হিসাববিজ্ঞানে পরিচালন ব্যয় সাধারণত সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের আয় থেকে বাদ দেওয়া হয়। এতে ওই বছরের নিট মুনাফার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে কোনো ব্যয়কে মূলধনি ব্যয় হিসেবে দেখানো হলে সেটি সম্কদ হিসেবে আর্থিক অবস্থার বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং কয়েক বছর ধরে অবচয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়।
ফলে পরিচালন ব্যয়কে মূলধনি ব্যয় হিসেবে দেখানো হলে সংশ্লিষ্ট বছরে কোম্কানির ব্যয় কম এবং মুনাফা তুলনামূলক বেশি দেখানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সম্কদের পরিমাণও বাস্তব অবস্থার চেয়ে বেশি দেখানোর ঝুঁকি থাকে।
এ কারণে অনুসন্ধান কমিটিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এমন শ্রেণিবিন্যাসের আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্কানির আর্থিক প্রতিবেদনে কী প্রভাব পড়েছে, কারা সম্ভাব্যভাবে সুবিধা পেয়েছেন এবং বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপিত মুনাফার চিত্র বদলে গেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখবে কমিটি।
এসব হিসাব অনুমোদন, বাস্তবায়ন কিংবা গোপন রাখার ক্ষেত্রে রবি আজিয়াটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটির কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রবি আজিয়াটা ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ইডটকো গ্রুপের মধ্যকার লেনদেন। অনুসন্ধান আদেশে থায়াপারান এস সাঙ্গারাপিল্লাইয়ের দ্বৈত ভূমিকা বিশেষভাবে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। তিনি একই সময়ে রবি আজিয়াটার চেয়ারম্যান এবং ইডটকো গ্রুপ এসডিএন বিএইচডির স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নথি অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইডটকোর স্বাধীন পরিচালক ছিলেন।
একই ব্যক্তির দুই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এমন দায়িত্ব পালনের কারণে তাদের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেনে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করবে বিএসইসি।
রবি ও ইডটকোর মধ্যকার টাওয়ার ও অবকাঠামো ইজারা, সেবা গ্রহণ, শেয়ার হস্তান্তরসহ সব ধরনের লেনদেন পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। এসব চুক্তি বাজারদর ও স্বাধীন বাণিজ্যিক শর্তে, অর্থাৎ আর্মস লেংথ ভিত্তিতে সম্কন্ন হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
একই সঙ্গে এসব লেনদেনের মাধ্যমে রবি আজিয়াটা থেকে আজিয়াটা গ্রুপ অথবা এর কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিক মূল্য, সম্কদ কিংবা অন্য কোনো সুবিধা স্থানান্তর হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের নির্দেশ রয়েছে। রবি আজিয়াটার দুই স্বাধীন পরিচালক আখতার সানজিদা কাসেম ও কামরান বকরের পদত্যাগের ঘটনাও বিএসইসির তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অনুসন্ধান আদেশ অনুযায়ী, তারা ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের পদত্যাগের পেছনে কী ধরনের হস্তক্ষেপ ছিল, কারা ওই হস্তক্ষেপ করেছিলেন এবং এর ফলে পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না, তা যাচাই করবে অনুসন্ধান কমিটি।
একই সঙ্গে সাঙ্গারাপিল্লাইয়ের সভাপতিত্বে পরিচালিত রবির অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও ন্যায্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর তার নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান পরিচালনায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
রবির পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান কমিটিগুলো প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষার নীতি অনুসরণ করেছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিএসইসির আদেশে রবি আজিয়াটার ২০২১ ও ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দুই বছরের প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা, বিরোধ, লেনদেন কিংবা আর্থিক তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করবে কমিটি।
করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন যথাযথভাবে দেখানো হয়েছে কি না এবং মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেসবও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
রবির সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নও তদন্তে বিবেচনা করা হবে। বিশেষ করে আইনি মামলা ও ফরেনসিক কার্যক্রমে ব্যয় করা অর্থ, সংশ্লিষ্ট পেশাগত ফি এবং এসব বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে অনুসন্ধান কমিটি।
বিএসইসি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিয়েছে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. রফিকুন্নবী, সহকারী পরিচালক তন্ময় কুমার ঘোষ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিনকে।
মূল আদেশে কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি তদন্তের প্রয়োজনে আদেশে উল্লিখিত বিষয়ের বাইরেও সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো বিষয় পরীক্ষা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
তবে নির্ধারিত প্রাথমিক সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে কমিটিকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পরিধি, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং লেনদেন বিশ্লেষণের কারণেই সময় বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
রবির সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা উত্তর দেওয়ার নাম করে কালক্ষেপণ করেন। আবার যোগাযোগ করা হলে তারা ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করার জন্য জানান।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বিষয়টি বর্তমানে অনুসন্ধানাধীন। অনুসন্ধান কমিটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য কমিশন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য এবং ব্যাখ্যা সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের বিষয়ে কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনের কাছে জমা হলে তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি তদন্তে সিকিউরিটিজ আইন, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড বা অন্য কোনো বিধিবিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কমিশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক হিসাব, করপোরেট সুশাসন বা স্বার্থের সংঘাতের মতো অভিযোগ উঠলে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ তালিকাভুক্ত কোম্কানির আর্থিক প্রতিবেদন এবং প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভর করেই লাখো বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। তাই তদন্তটি অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়মতো শেষ হওয়া প্রয়োজন। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষে ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না, বরং পুরো পুঁজিবাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক বার্তা যাবে।
অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে সেটিও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে। কারণ অভিযোগগুলো শুধু একটি কোম্কানির হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলোর সঙ্গে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্নও জড়িত।






