শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেখ হাসিনা-কাদের-কামাল-নিজাম হাজারীসহ ১৭০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কলেজ শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ পলাতক মোট ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ফেনী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হাসান এ আদেশ দেন।

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে এক দফা দাবিতে চলমান ছাত্র-জনতার অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন কলেজ ছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৬২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ৩১ জুলাই তৎকালীন ফেনীর পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানান, মামলায় এজাহারনামীয় ১২ জন ও সন্দেহভাজন ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মুরাদ হাসান বাবুসহ তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্তে এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাত মিলিয়ে মোট ২২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, আদালত পলাতক ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এদের মধ্যে চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিচার শিশু আদালতে সম্পন্ন হবে।

ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন মামুন বলেন, প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে। এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ও ১৩ নভেম্বর অভিযোগপত্র গ্রহণের তারিখ ধার্য থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২২ জানুয়ারি।

এ মামলায় আরও যাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন—ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন, পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেল, সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটনসহ আরও অনেকে।

নিহত মাসুম সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের তরাব পাটোয়ারী বাড়ির মৃত মাওলানা নোমান হাসানের ছেলে। তিনি ছাগলনাইয়ার আব্দুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিহতের ভাই ও মামলার বাদী মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। দ্রুত সময়ের মধ্যে সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।” তিনি অভিযোগ করেন, ৪ আগস্ট মহিপালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতেই মাসুম নিহত হন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপালের সহিংসতার ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় এখন পর্যন্ত মোট ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হত্যা এবং ১৭টি হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।

শেয়ার করুন