নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং কারখানা বন্ধের নির্দেশনার পরও থামছে না অবৈধ চুনা ও চুল্লি কারখানার কার্যক্রম। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ২০টিরও বেশি চুনা ও ঢালাই কারখানা সরকারি গ্যাস লাইনের অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কারখানার মাধ্যমে একটি চক্র প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সুবিধা আদায় করছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল এবং সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় পরিবেশবিধ্বংসী এসব কারখানা নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার এসব কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারমূল্যে যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি। তবে এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস ব্যবহারের বিপরীতে কোনো বিল আদায় করতে পারছে না তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা জসীম উদ্দিন স্বপন একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে মেঘনাঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে চুনা কারখানা পরিচালনা, গ্যাস চুরি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে চুনা পোড়ানোর কার্যক্রম চলছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ও ঘটছে।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, তিতাস গ্যাসের মেঘনাঘাট জোনের এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ইসমানপুর, জামপুর, মোগড়াপাড়া এবং সোনারগাঁ পৌরসভাসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত এসব কারখানাকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান, অধিকাংশ কারখানায় সপ্তাহে একবার উৎপাদিত চুনা বাজারজাত করা হয়। অভিযানের সময়সূচি সম্পর্কে আগাম তথ্য পেয়ে মালিকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। তাদের দাবি, কিছু অসাধু কর্মচারী নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে এসব তথ্য সরবরাহ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলো ২৪ ঘণ্টা সচল থাকায় আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি কারখানার অতিরিক্ত তাপ পাশের বসতবাড়িগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
এদিকে দিনের পর দিন চুনাপাথর পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়া, ছাই ও ক্ষতিকর কণায় আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি এবং বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, গাছপালা ও জনস্বাস্থ্য।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, “আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিস এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো ফায়ার লাইসেন্স প্রদান করে না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধিক মুনাফার আশায় নতুন করে অনেকেই এই ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের অভিযান ও কারখানা সিলগালার পরও কয়েকদিনের মধ্যেই সেগুলো আবার চালু হয়ে যায়। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—অভিযানের পরও কীভাবে বারবার সচল হচ্ছে এসব অবৈধ কারখানা এবং কারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “অভিযানের পর কয়েকদিন কারখানা বন্ধ থাকে। পরে আবার আগের মতো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এতে মনে হয় সবকিছু আগেই সমন্বয় করা থাকে।”
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সোনারগাঁ অঞ্চলের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, কারখানা উচ্ছেদ এবং মামলা দায়েরের পরও অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, অবৈধ চুনা কারখানা বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিতাস কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনে সোনারগাঁও শাখার সভাপতি ফজলুল হক ভূঁইয়াসহ একাধিক নেতা বলছেন, অবৈধ চুনা ও চুল্লি কারখানা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। গ্যাস চুরি, পরিবেশ দূষণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।









