শুক্রবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আসন্ন নির্বাচন, আস্থার সংকট ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা ও গভীর আস্থার সংকট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জনমনে একটি মৌলিক প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এই নির্বাচন কি সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে? ভোটাররা কি নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, নাকি এটি আবারও একটি পূর্বনির্ধারিত ও প্রশ্নবিদ্ধ আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে?

আজও এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নেই। বরং ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার ভারে ভোটাধিকার আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সহিংসতা ও প্রাণহানির আশঙ্কা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে, এই নির্বাচনে আর কোনো লাশ পড়বে না—এই নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবে? অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে আশ্বস্ত করার বদলে আরও আতঙ্কিত করছে। নির্বাচন ঘিরে রক্তপাতের স্মৃতি এখনো তাজা, আর সেই স্মৃতিই ভোটারদের মনে ভয়ের বীজ বপন করছে।

ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি ও সামগ্রিক আচরণ ঘিরে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা গণতন্ত্রের জন্য এক গুরুতর অশনিসংকেত। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন করা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—সেই আস্থাই আজ সবচেয়ে বড় সংকটে।
নির্বাচন কমিশন যদি নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে না পারে, তবে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আদর্শিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি হত্যাকাণ্ডের এক মাসের ব্যবধানে স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা—এসব নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা শুধু একটি দলের নয়, বরং পুরো সমাজের ক্ষোভেরই প্রতিফলন। অভিযোগপত্র দাখিলের পরও যদি প্রধান অভিযুক্তরা আইনের বাইরে থাকে, তবে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাজধানীর বনশ্রীতে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার লিলির নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং কাওরান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। নির্বাচনের আগে এসব ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে সন্দেহ আরও গভীর হবে, ভয় আরও ছড়াবে, আর ভোটারদের অংশগ্রহণ আরও কমবে।

রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি সরাসরি ভোটাধিকারকে বিপন্ন করে। ভয়ের পরিবেশে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে চায় না—এটাই বাস্তবতা। ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া কিংবা ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন যদি কেবল সংখ্যার হিসাব ও আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা গণতন্ত্র নয়—বরং গণতন্ত্রের ব্যর্থতা।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি দলের নেতা-কর্মীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেছেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন—একটি পক্ষ এখনো নির্বাচন বানচালের নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

বিশিষ্ট নাগরিক ও নির্বাচন সংস্কারক ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন—নির্বাচনী অঙ্গন পরিচ্ছন্ন করতে হবে, টাকার খেলা ও ভোট কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে, এবং নির্বাচনকে কারসাজিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে হবে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত।

এই দেশের মানুষ ইতিহাসজুড়ে বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে—১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু প্রতিবারই তারা পেয়েছে গুম, খুন, দুর্নীতি ও দখলদারির তিক্ত অভিজ্ঞতা।

একজন জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান—এই মানুষগুলোকে আর প্রতারণার চক্রে ফেলবেন না। মানুষ যদি এবারও আশাহত হয়, তবে সামনে আর কোনো শান্তিপূর্ণ পথ খোলা থাকবে না—যার পরিণতি রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের শাসনব্যবস্থাকে হতে হবে টেকসই, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষকে বারবার রক্ত দিতে বা বিপ্লবে নামতে না হয়। ব্যক্তিনির্ভর শাসনের বদলে প্রতিষ্ঠাননির্ভর শাসন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

প্রতিষ্ঠান গড়া কঠিন, সময়সাপেক্ষ—কিন্তু সেই চেষ্টা থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। কারণ টেকসই জাতি ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র সম্ভব নয়, আর টেকসই গণতন্ত্র ছাড়া একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
লেখক ও গবেষক
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব

শেয়ার করুন