বেক্সিমকোসহ ৩৪ খেলাপির কারণে সংকটে জনতা ব্যাংক

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৭২ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৬৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগের বছর এ হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও নিট সুদ-আয়ের ঘাটতির কারণে লোকসানও বেড়েছে। গত বছরে জনতা ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।

জনতা ব্যাংকের সবচেয়ে বড় খেলাপি ঋণ রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের। গ্রুপটির নামে মোট খেলাপি ঋণ ২৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা। এছাড়া বেক্সিমকো লিমিটেডের নামে প্রায় ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকার ঋণ পুরোপুরি খেলাপি। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের নামে ২২ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার বেশি ঋণও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এস আলম গ্রুপ। তাদের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৬৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর সঙ্গে অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের ২ হাজার ১২৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা যুক্ত করলে মোট খেলাপি ঋণ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে এননটেক্স গ্রুপ, যার খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৭১ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এছাড়া থার্মেক্স গ্রুপের ২ হাজার ১১১ কোটি টাকা, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ২ হাজার ৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং রাঙ্কা গ্রুপের ১ হাজার ৭২৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা খেলাপি রয়েছে।

৩৪টি বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৬৫৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ এককভাবে সর্বোচ্চ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং সর্বনিম্ন ১০৩ কোটি টাকা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি। কেবল বসুন্ধরা গ্রুপ আংশিক পরিশোধ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যার মধ্যে ৮৪৯ কোটি টাকা এখনো খেলাপি রয়েছে।

খেলাপির তালিকায় আরও রয়েছে জনকণ্ঠ গ্রুপ (৯৬৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা), সিকদার গ্রুপ (৮৯১ কোটি টাকা), লিথুন ফেব্রিক্স লিমিটেড (৮০৫ কোটি টাকা), লেক্সো লিমিটেড (৭৬৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা), হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (৬৯৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা), চৌধুরী গ্রুপ (৬২৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা) ও ঢাকা নর্থ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (৫০০ কোটি ১৬ লাখ টাকা)। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণও পুরোপুরি খেলাপি।

তালিকায় আরও রয়েছে আদিল করপোরেশন (৪২৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা), আনসার ইন্টারপ্রাইজ (৪২৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা), মুরাদ ইন্টারপ্রাইজ (৪২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা), ইব্রাহিম গ্রুপ (৪২২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা), ড্রাগন গ্রুপ (৩৫৯ কোটি টাকা), ফাহামি গ্রুপ (৩৪৮ কোটি টাকা), হ্যানসল পেপার মিলস (৩৪১ কোটি টাকা), গ্রিন টাউন এলপি গ্যাস (৩২৯ কোটি টাকা), লকপুর গ্রুপ (৩১৭ কোটি টাকা), সিক্স সিজন্স (৩০৯ কোটি টাকা), নর্দান পাওয়ার সলিউশনস (২৯৬ কোটি টাকা), আসিফ গ্রুপ (২৭৭ কোটি টাকা), সোনালি ট্রেডার্স (২৭৩ কোটি টাকা), আলী পেপার্স, টেকনোফ্লাস্ট ও কোয়ালিটি মিল্কস (২৪৪ কোটি টাকা), কোনিকা কমার্শিয়াল (২৩৬ কোটি টাকা) এবং দ্য ডেলটা কম্পোজিট (১০৩ কোটি টাকা)। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণও পুরোপুরি খেলাপি।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে জনতা ব্যাংকে তীব্র তারল্য সংকট চলছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার মতো তহবিল নেই। খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ, আদালতে মামলা এবং চেক ডিজ-অনারসহ ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের সম্পদ নিলামে তোলা হয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের পাচার হওয়া সম্পদ অনুসন্ধানে বিদেশি ল-ফার্মের সঙ্গে এনডিএ চুক্তির মাধ্যমে কাজ চলছে। কোনো সম্পদের হদিস মিললে আইনি প্রক্রিয়ায় তা জব্দ ও দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, জনতা ব্যাংক নিজে ঘুরে না দাঁড়ালে সরকারের সরাসরি সহায়তার সুযোগ সীমিত। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো এখন বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হওয়ায় খেলাপি আদায়ে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। প্রয়োজনে নীতি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রস্তুত থাকবে।

শেয়ার করুন