দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রায় আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় ঘাটতি রয়েছে। বাহিনীর জন্য একটি কেন্দ্রীয় হাসপাতাল থাকলেও সেখানে নেই কোনো স্থায়ী সাইকিয়াট্রিস্ট। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, হতাশা ও অবসাদে ভোগা অনেক সদস্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
গত বছরের ১৯ জুন পটুয়াখালীর একটি পুলিশ ব্যারাক থেকে তৃষা বিশ্বাস নামে এক নারী কনস্টেবলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাত্র দুই বছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই সদস্যের কক্ষ থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র পাওয়া যায়, যেখানে তার আত্মহত্যাপ্রবণতার উল্লেখ ছিল এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি তা অনুসরণ করেননি কিংবা বিষয়টি কাউকে জানাননি।
একই ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়েও ঘটেছে। খুলনা রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাস নিজের অস্ত্রের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক জটিলতা ও মানসিক চাপে তিনি ভুগছিলেন বলে জানানো হয়। এর আগে পুলিশ কনস্টেবল রুবেল মিয়া ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেন। এছাড়া দায়িত্ব পালনকালে সহকর্মীর ওপর গুলি চালানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সদস্যের দীর্ঘদিনের মানসিক সমস্যার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের কাজের ধরনই তাদের জন্য বড় মানসিক চাপের উৎস। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান, অপরাধীদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ছুটি ও পদোন্নতির অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের পেশাজীবীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা সব সময় চাপের মধ্যে থাকেন। মানুষের সেবা দিতে গিয়ে অনেক সময় তারাই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ পরিস্থিতিতে তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য পুলিশ বাহিনীতে সাইকিয়াট্রিস্ট থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতায়ও উঠে এসেছে একই চিত্র। অনেকেই জানান, টানা ডিউটি, ছুটির অভাব, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ এবং পারিবারিক প্রত্যাশার কারণে মানসিক চাপ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঈদসহ গুরুত্বপূর্ণ সময়েও পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের। এতে হতাশা ও একাকীত্ব আরও বাড়ে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম মনে করেন, পুলিশের কাজের প্রকৃতি বিবেচনায় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কাউন্সেলিং এবং হাসপাতালগুলোতে সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। ইউনিট কমান্ডারদেরও অধীনস্থ সদস্যদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাহিনীতে প্রায় আড়াই লাখ সদস্য কর্মরত। তাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকার রাজারবাগে একটি কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও স্থায়ী কোনো চিকিৎসক নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের ৫৯টি জেলায় পুলিশ সদস্যদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও কোথাও পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ সদস্যরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের কাছে দাবি তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ, বিভাগভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট গঠন এবং নিয়মিত কাউন্সেলিং চালু করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো হয়ে উঠছে।





