দেশের দুই পরিচিত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম ও সেবা প্ল্যাটফর্মে বকেয়া বেতনকে কেন্দ্র করে কর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন। বিনিয়োগ সংকট এবং রাজস্ব কমে যাওয়াকে এ পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি যশোরে চালডালের প্রায় ৬০০ কর্মী বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পরে ডিসেম্বর মাসের বেতন পরিশোধ করা হলে যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত চালডালের কল সেন্টারের কর্মীরা আবার কাজে যোগ দেন।
চালডাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। তাদের অধিকাংশই জানুয়ারি মাসের বেতন পাননি, ফলে অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির মাসিক বেতন ব্যয় ১২ কোটি টাকার বেশি।
চালডাল ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিম আলিম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কখনো বেতন দিতে সমস্যা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করলেও শেষ পর্যন্ত ৫০ কোটির কম বিনিয়োগ পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্টার্টআপগুলো সহজে ব্যাংক ঋণ পায় না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেলে আর্থিক সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চালডাল ডটকম মোট ৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৩ লাখ ডলার দেশীয় বিনিয়োগ এবং বাকি প্রায় ২ কোটি ৯১ লাখ ডলার এসেছে বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থেকে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চালডালের মোট রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা। একই সময়ে কর–পূর্ব মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে সেবা প্ল্যাটফর্মেও বেতন বকেয়া নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪৫০ জন কর্মী রয়েছেন এবং তাদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়। তবে বর্তমানে প্রায় ৩০০ কর্মীর তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে।
একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, কয়েক মাসের বেতন না পাওয়ায় অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরছেন।
এদিকে সেবা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে বকেয়া বেতন ও কর সংক্রান্ত অভিযোগে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রোনাল্ড মিকি গোমেজ তাঁর বেতন ও অন্যান্য পাওনা দাবি করে শ্রম আদালতে মামলা করেছেন। পাশাপাশি বেতনের বিপরীতে কর বাবদ প্রায় ১৮ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগেও একটি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালত সেবা এক্সওয়াইজেডের চেয়ারম্যান আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
তবে এ বিষয়ে আদনান ইমতিয়াজ বলেন, সেবা শুরু থেকেই দেশীয় বিনিয়োগে পরিচালিত একটি স্টার্টআপ। গত বছরের নভেম্বর মাসে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়ে। রাজস্ব প্রায় শূন্যে নেমে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের অনেক স্টার্টআপই অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে। ফলে কর্মীদের বেতন পরিশোধসহ নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।





