শুক্রবার, ২৭শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তামাক পাতা কেনায় ভ্যাট দেওয়ার তোয়াক্কা করে না ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

বছরের পর বছর তামাক পাতা কেনার ওপর আরোপিত উৎসে ভ্যাট না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন করে (মূসক) নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, বিএটি ব্যংলাদেশ ২০২২ ও ২০১৩-এই দুই বছরে তামাক পাতা কেনার ওপর প্রায় ২৫১ কোটি টাকা উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ভ্যাট পরিশোধ না করায় সম্প্রতি শুনানি শেষে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এলটিইউ।

এদিকে দাবিনামার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গেছে বিএটি। এনবিআরের শুনানিতেও রিট আবেদনের কথা তুলে ধরেছে বিএটি। তবে উচ্চ আদালত এই বিষয়ে কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় কারণ সর্শানো নোটিশের বিপরীতে চূড়ান্ত কর নির্ধারণ আদেশ জারিতে আইনানুগ কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই বলে দাবি করেছে এলটিইউ। ২৫১ কোটি টাকার দাবিনামাটি নির্ধারিত সময়ে চূড়ান্ত না করা হলে সরকার প্রাপ্য রাজস্ব হতে বঞ্চিত হবে।

অথচ তামাক পাতা দিয়ে সিগারেট বিক্রি করে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটি বাংলাদেশ)।

এনবিআর সূত্রমতে, তামাক পাতা কেনায় উৎসে ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগ গেয়ে বিএটি বাংলাদেশের ২০২২ ও ২০২৩ সালের তামাক পাতা ক্রয়সংক্রান্ত দলিলাদি যাচাই করে এনবিআর। নিরীক্ষায় দেখা যায়, দেশের সিগারেট বাজারের এক তৃতীয়াংশ স্থান দখলকারী কোম্পানি বিএটি তামাক পাতা ক্রয়ের ওপর এক টাকাও ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিএটির বিরুদ্ধে উৎসে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করা হয়। মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২৫২০২৩ সালে বিএটি বাংলাদেশ স্থানীয়ভাবে মোট ৩ হাজার ৩৫৩ কোটি ৫৬ লাখ ২৪ হাজার টাকার গ্রামাক পাতা কিনেছে। এতে সাধরুণ শতাংশ হারে ২৫১ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকার উৎসে ভ্যাট প্রযোজ্য। ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হলে সুদসহ প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওনা হবে।

এনবিআরের হিসাব বলছে, বিএটি বাংলাদেশ ২০২২ সালে ৩৬ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার সিখ্যারেট বিক্রি করেছে, যাতে ১ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকার মুনাফা হয়েছে। আর ২০২৩ সালে ৪০ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকার সিগারেট বিক্রিতে ১ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

অথচ যে পাতা দিয়ে সিগারেট উৎপাদন করে সিগারেট বাজারজাত করেছে, তার ভ্যাট পরিশোধ করেনি বিএটি। এলটিইউ বলছে, বিএটি মুসক ৬ দশমিক ১-এ তামাক পাতা ক্রয় অন্তর্ভুক্ত করেনি এবং ওই সেবার ওপর উৎসে মুসক কর্তন করেনি। ২০২২ ও ২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষে বলবৎ আইনের প্রথম তফসিল অনুযায়ী হেডিং ২৪ দশমিক শূন্য ১ এর অন্তর্ভুক্ত তামাক পাতা অব্যাহতিপ্রাপ্ত ছিল না। এই বিষয়ে গত বছর ৩ নভেম্বর কোম্পানিটিকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।

এলটিইউ বলছে, উৎসে মূল্য সংযোজন কর কর্তন ও আদায় বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি-৪ এর উপবিধি (খ) অনুযায়ী, ‘প্রজ্ঞাপন দ্বারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত কোনো পণ্য বা সেবা জোগানদার কর্তৃক সরবরাহ প্রদানের ক্ষেত্রে জোগানদার সেবা হিসেবে সরবরাহ গ্রহণকারীকে উৎসে মুসক কর্তন করতে হবে।’ মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর তফসিল দ্বারা তামাক পাতা সরবরাহের ওপর মুসক অব্যাহতিপ্রাপ্ত নয়। একসময় অপ্রক্রিয়াজাত তামাক অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে আরেক আদেশে ‘জোগানদারের সংজ্ঞায় করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অর্থ হলো যে পণ্য বা সেবা সরবরাহ নেওয়া হয়েছে, তা করযোগ্য হতে হবে। তবে পণ্য বা সেবার করযোগ্যতা আইনের প্রথম তফসিলের ভিভিতে নিরূপিত হবে।’

এনবিআরের আরেক আদেশ অনুযায়ী, উৎসে কর কর্তনকারী স্বত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে অপ্রক্রিয়াজাত তামাক ক্রয়কালে উৎসে মুসক কর্তন ও জমা প্রদানে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এনবিআর সূত্রমতে, এলটিইউ থেকে নোটিশ জারির পর বিএটি বাংলাদেশ লিখিত জবাব দাখিল করে। একইসঙ্গে ৩ ডিসেম্বর বিএটি বাংলাদেশের মনোনীত কর্মকর্তা ও আইনজীবী এলটিইউ কমিশনারের শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। শুনানি শেষে ৭ জানুয়ারি চূড়ান্ত সাবিনামা জারি করা হয়। শুনানিতে বিএটির মনোনীত কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা বলেন, একই বিষয়ে এলটিইউ আগেও দাবিনামা জারি করেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৯ আগষ্ট উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে। এলটিইউর জারি করা ২৫১ কোটি টাকার কারণ দর্শানো নোটিশও একই ধরনের বলে এর কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। তবে শুনানিতে এলটিইউ কমিশনার বলেন, ‘প্রত্যেকটি মামলা ইউনিক বা স্বতন্ত্র এবং আলোচা দাবিনামাটি নির্ধারিত সময়ে চূড়ান্ত না করা হলে তা সময় দ্বারা বারিত হবে এবং সরকার প্রাপ্য রাজস্ব হতে বঞ্চিত হবে। তাছাড়া উচ্চতর আদালত হতে এই বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বা স্থগিতাদেশ নেই। ফলে আলোচ্য কারণ দর্শানো নোটিশের বিপরীতে চূড়ান্ত কর নির্ধারণ আদেশ জারি করার আইনানুগ কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। প্রতিষ্ঠানের অনুরোধ আমলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

চূড়ান্ত দাবিনামায় আদেশে বলা হয়েছে, সব প্রতিবেদন, কারণ দর্শানো নোটিশ ও নোটিশের জবাব ও শুনানিতে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যেহেতু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ উৎসে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কর্তন ও আদ্যয় বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি-৪ এর উপবিধি (খ) এর সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে। সেহেতু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ২০২২ ও ২০২৩ সালের ফাঁকি দেওয়া ২৫১ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুদ্ধ আইন, ২০১২ এর ধারা ৭৩(২) অনুযায়ী চূড়ান্ত কর নির্ধারণ করা হলো। এছাড়া একই আইনের ১২৭(১) ধারা অনুযায়ী সুদ আদায়যোগ্য। অর্থাৎ ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সুদ গণনা করা হবে।

তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল পরিমাণ পাতা উঠে গেছে- এই অজুহাতেও ভ্যাট দেয়নি বিএটি। মুসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (ভ্যাট গোয়েন্দা) বিএটি বাংলাদেশের ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষা করেছে। তাতে বেনসন, গোল্ডলিফ (জেপিজিএল), ক্যাসষ্টন, স্টার, রয়েল, ডারবি, লাকি, পাইলট, হলিউড ব্র‍্যান্ডের সিগারেট উৎপাদনে কী পরিমাণ তামাক পাতা ব্যবহৃত হয়েছে এবং কি পরিমাণ পাত্য অপচয় হয়েছে, তার হিসাব করা হয়েছে। মূসক-১৫ অনুযায়ী কোম্পানিটি চার বছরে তামাক ব্যবহার করেছে ১৩ কোটি ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৮৭২ কেজি। আর মূসক-১ অনুযায়ী তামাক ব্যবহার করেছে ১৩ কোটি ৮৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯৬ কেজি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ৫২ লাখ ২৯ হাজার ৫২৬ কেজি তামাক ব্যবহার করলেও এর ওপর কোনো সম্পূরক শুল্প, ভ্যাট ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ পরিশোধ করেনি। এই বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দাকে কোম্পানি জানিয়েছে যে, উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণের সময় তামাকের পাতাগুলো এমনভাবে গুঁড়ো করা হয়, যা বাতাসে উড়ে গেছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘বিএটি বাংলাদেশ যে তামাক পাতা দিয়ে সিগারেট তৈরি ও বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে, সেই তামাক পাতার ওপর ভ্যাট নেয় না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর আগেও একইভাবে এলটিইউ নিরীক্ষা করে বিএটির তামাক পাতা কেনার ওপর উৎসে ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতে রিট করে তা থামিয়ে দেয়। এবারও একইভাবে ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান এই নিয়ে আদালতে গেছে।

এলটিইউ আদালতকে বলেছে, প্রতিটি নিরীক্ষা আলাদা। এই বিপুল পরিমাণ ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধ করতে টালবাহানা করছে বিএটি।’

শেয়ার করুন